
নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলার এক সেনা দাবি করেছেন যে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানে মার্কিন বাহিনী একটি অজ্ঞাত সনিক ওয়েপন বা ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন ব্যবহার করেছিল। এই অস্ত্রটি রাডার এবং সেনাদের অকার্যকর করে দিয়েছিল। এটা ছিল একটি অত্যন্ত তীব্র শব্দ তরঙ্গের মতো। তিনি দাবি করেন, এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক ও মারাত্মক। ওই সেনা দাবি করেছেন যে ওই জায়গায় উপস্থিত সবার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করেছিল। কেউ কেউ রক্ত বমিও করছিল। নড়াচড়া করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল অনেকে। এই দাবিটি সনিক অস্ত্রের জগতে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেগুলোকে প্রাণঘাতী নয় কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই ধরনের অস্ত্র কি সত্যিই আছে? এগুলো কীভাবে কাজ করে, এদের প্রভাব কী এবং কোন দেশগুলোর কাছে এগুলো আছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
সনিক ওয়েপন বা অস্ত্র কী?
সনিক ওয়েপন, যাকে কখনও কখনও অ্যাকোস্টিক বা আল্ট্রাসনিক অস্ত্রও বলা হয়। এটি হল এমন অস্ত্র, যা শত্রুকে আহত বা অকার্যকর করতে ব্যবহার করে। এগুলো হলি ডিরেক্ট-এনার্জি ওয়েপনস-র (DEW) একটি শ্রেণি, যেখানে শক্তি (শব্দ তরঙ্গ) একটি লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা হয়। এই অস্ত্রগুলো প্রধানত তিন প্রকার।
উচ্চ-তীব্রতার শ্রবণযোগ্য শব্দ অস্ত্র: যেমন লং রেঞ্জ অ্যাকোস্টিক ডিভাইস (LRAD), যা সাধারণ কথোপকথনের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি জোরে, ১৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ তৈরি করে।
ইনফ্রাসাউন্ড অস্ত্র: ২০ হার্টজের কম কম্পাঙ্কের শব্দ, যা মানুষের কান শুনতে পায় না কিন্তু শরীরের উপর প্রভাব ফেলে।
আল্ট্রাসনিক অস্ত্র: ২০ কিলোহার্টজের বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ, যা শোনা না গেলেও লক্ষ্যবস্তুকে প্রভাবিত করে। এই অস্ত্রগুলো প্রচলিত অস্ত্র থেকে এই কারণে আলাদা যে এগুলো গুলি বা বিস্ফোরকের পরিবর্তে শব্দ ব্যবহার করে। এগুলোকে প্রাণঘাতী নয় বলে মনে করা হয়, তবে উচ্চ তীব্রতায় এগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে।
সনিক ওয়েপন কী করতে পারে?
সনিক ওয়েপনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল লক্ষ্যবস্তুকে স্পর্শ না করে তাকে অকার্যকর করা। উচ্চ-তীব্রতার শব্দ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, যার ফলে তারা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং আক্রমণ করতে অক্ষম হয়। উদাহরণস্বরূপ, জলদস্যুদের প্রতিহত করতে জাহাজে LRAD ব্যবহার করা হয়। কিছু উন্নত শব্দভিত্তিক যন্ত্র শব্দ তরঙ্গ দিয়ে ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে হস্তক্ষেপ করতে পারে, যার প্রমাণ মেলে ভেনেজুয়েলার রাডার অকার্যকর হওয়ার দাবি থেকে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। সার্বিয়ায়, ২০২২ সালের বিক্ষোভে পুলিশ এমন অস্ত্র ব্যবহার করেছিল যা আইনত অবৈধ ছিল। কিছু অস্ত্র হ্যালুসিনেশন সৃষ্টি করতে পারে বা ভয়, দুঃখ, উদ্বেগের মতো আবেগ জাগিয়ে তুলতে পারে। এই অস্ত্রগুলো শত শত মিটার দূর থেকেও কার্যকর, ফলে আক্রমণকারীরা নিরাপদ থাকে।
সনিক ওয়েপনের প্রভাব কী কী?
শারীরিক প্রভাব: তীব্র কানের ব্যথা, দিকভ্রান্তি, কানের পর্দা ফেটে যাওয়া, শ্রবণশক্তি হ্রাস। উচ্চ কম্পাঙ্কে নাক দিয়ে রক্তপাত, রক্তবমি, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বুকে চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।
মানসিক প্রভাব: ভয়, দুঃখ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, হ্যালুসিনেশন। কিউবায় ২০১৬-২০১৭ সালের হাভানা সিনড্রোমের সময় মার্কিন কূটনীতিকরা মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা এবং মস্তিষ্কের অস্পষ্টতার অভিযোগ করেছিলেন, যা সোনিক আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: ক্যান্সারের ঝুঁকি (কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে), পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব, যেমন প্রাণীজগতের উপর প্রভাব। সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবে উচ্চ মাত্রায় মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সার্বিয়ায় এর ব্যবহার আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কারণ এগুলো স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এই প্রভাবগুলো কেবল মানুষকেই নয়, পরিবেশ এবং জীবন্ত প্রাণী, যেমন পাখি বা সামুদ্রিক জীবকেও প্রভাবিত করে।
কোন দেশগুলোর কাছে সনিক ওয়েপন আছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চিন, ইজরায়েল, গ্রিস, সার্বিয়ার কাছে এই অস্ত্র রয়েছে। ব্রিটেন, ভারত, জার্মানি এবং ফ্রান্সে গবেষণা চলছে। অনেক দেশের পুলিশ বাহিনী এলআরএডি ব্যবহার করে।