
World Most Populous Country: ভারত চিনকে ছাড়িয়ে গেছে, যা একসময় বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ছিল। সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে ভারত এখন প্রথম স্থানে রয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ে আলোচনা হয় কারণ প্রতি বছর ১১ই জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। বিশ্বের জনসংখ্যা ৮.২ বিলিয়নে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই বিশেষ দিনটি ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যখন বিশ্বের জনসংখ্যা পাঁচ বিলিয়নে পৌঁছেছিল। জেনে নেওয়া যাক ভারতের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কি না। এটি কি গর্বের বিষয় নাকি উদ্বেগের? বিশ্বের শীর্ষ ১০টি জনবহুল দেশ কোনগুলো?
ভারতের জনসংখ্যা ১.৪ বিলিয়নের বেশি বলে অনুমান করা হয়। চিনের জনসংখ্যা এখন ধীরে ধীরে কমছে। অন্যদিকে, ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে, কিন্তু মোট সংখ্যা এখনও অনেক বেশি। ভারতে যুব জনসংখ্যা ৬৫ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়। এই বিশাল জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মরত। এই পরিস্থিতি সব দেশে দেখা যায় না। এটি ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। কিন্তু ভারতকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কাজ করতে হবে।
পরিকল্পনা অবশ্যই জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে হতে হবে, নির্বাচনী বিবেচনার উপর নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অনেক ইউরোপীয় দেশ এবং চিনে বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সেখানে তরুণ কর্মশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। ভারতের একটি তরুণ শক্তির ভিত্তি রয়েছে। এটি একটি সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগটি তখনই সুফল দেবে, যদি তরুণরা সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান পায়।
একটি বিশাল জনসংখ্যা ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ভারতের একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। এখানকার লক্ষ লক্ষ মানুষ কেনাকাটা করে। তারা মোবাইল ফোন, পোশাক, খাদ্য, আবাসন, যানবাহন, শিক্ষা এবং ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহার করে। এটি সংস্থাগুলির জন্য একটি বড় বাজার সরবরাহ করে। দেশে যখন ভোক্তার সংখ্যা বাড়ে, তখন উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে। ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী।
জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা-৫ এর পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। ২০১৯-২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার ৫৭ শতাংশ। এর মানে হলো, ৫৭ শতাংশ নারী রক্তাল্পতায় ভুগছেন। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা-৪, অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সালে, এই সংখ্যাটি ছিল ৫৩ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫৩ শতাংশ রক্তাল্পতায় ভুগছিলেন। এর মানে হলো, এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা যে নারীরা যদি সুস্থ না থাকেন, তবে তাদের সন্তানরাও অসুস্থ হয়ে জন্মাবে। পুরো প্রজন্মই দুর্বল হয়ে পড়বে। এই পরিসংখ্যানগুলো আরও দেখায় যে স্বাস্থ্যসেবা খাতে এখনও অনেক কাজ বাকি। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে জনসংখ্যার অর্ধেকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অংশগ্রহণ অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
প্রতি বছর ভারতে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছায়, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি তৈরি করা সহজ নয়। শুধুমাত্র ডিগ্রি দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। তরুণদের এমন দক্ষতারও প্রয়োজন যা বাজারের চাহিদা পূরণ করে। নির্মাণ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, পর্যটন, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং সবুজ শক্তির মতো ক্ষেত্রগুলিতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ, এগুলো বিপুল সংখ্যক মানুষকে কর্মসংস্থান দিতে পারে। ভারতের শুধু চাকরিপ্রার্থী তরুণদেরই প্রয়োজন নেই; এমন তরুণদেরও প্রয়োজন যারা চাকরি দিতে পারে। এটি অর্জনের জন্য উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করতে হবে। সহজ ঋণ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য।
শিক্ষার স্তরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। মানুষ শিক্ষিত হলেই জনসংখ্যা শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতে বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ বাড়লেও, শিক্ষার গুণগত মান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অনেক শিশু প্রাথমিক পড়া, লেখা এবং গণিতে সমস্যায় ভোগে। উচ্চশিক্ষার উন্নতিও অপরিহার্য। কলেজ শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান বাজারের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, কাজের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষাগত দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের উপর জোর দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং ডেটার মতো ক্ষেত্রগুলো নতুন সুযোগ তৈরি করে। প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর এবং স্বাস্থ্যকর্মীর মতো ব্যবহারিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশাল জনসংখ্যা সরাসরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলে। হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, ওষুধ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু পুষ্টি, টিকাদান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অপুষ্টি এবং রক্তাল্পতার মতো সমস্যা এখনও অনেক পরিবারকে প্রভাবিত করে। সুস্থ নাগরিকরাই উৎপাদনশীল নাগরিক হয়ে ওঠে। সুতরাং, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়কে শুধুমাত্র জনকল্যাণমূলক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
জনসংখ্যা সমস্যার ক্ষেত্রে নারীর শিক্ষা ও অধিকার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েরা যখন স্কুলে যায়, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন পারিবারিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে। স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। শিশুদের শিক্ষার প্রতি মনোযোগ বাড়ে। পরিবার পরিকল্পনা চাপের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি তথ্য, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হওয়া উচিত। নারীদের নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত। শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা ভারতের জন্য একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও বটে। কোনো দেশই তার অর্ধেক জনসংখ্যাকে আটকে রেখে নিজের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না। চিন থেকে কী শেখা যেতে পারে?
চিনের কমতে থাকা জনসংখ্যা জনতাত্ত্বিক ভারসাম্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। কম জন্মহার এবং ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা ইতিমধ্যেই কর্মশক্তির উপর প্রভাব ফেলছে। ভারতকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে আজকের তরুণ জনগোষ্ঠী চিরকাল তরুণ থাকবে না। ভারতকে এখনই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। যদি আজ শিশুদের শিক্ষা, যুবকদের দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়, তবে আগামী দশকগুলিতে দেশটি আরও ভালো অবস্থানে থাকবে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হয়ে ওঠা ভারতের জন্য কেবল গর্ব বা উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছে অপরিসীম সম্ভাবনা। এই জনসংখ্যাই ভারতকে একটি প্রধান বৈশ্বিক বাজার, একটি বিশাল কর্মশক্তি এবং একটি প্রধান উদ্ভাবন কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। কিন্তু এর জন্য সঠিক নীতি অপরিহার্য।
আমাদের প্রয়োজন ভালো শিক্ষা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, বিশুদ্ধ জল, নিরাপদ শহর এবং নারীদের জন্য সমান সুযোগ। জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম হয়ে ভারতের প্রকৃত বিজয় অর্জিত হবে না। প্রকৃত বিজয় তখনই আসবে, যখন প্রত্যেক ভারতীয় মর্যাদাপূর্ণ জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজের সুযোগ পাবে। কেবল তখনই ভারতের জনসংখ্যা জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হয়ে উঠবে, বোঝা নয়।