
ভারত-চিন সীমান্তের কাছে নিজেদের সামরিক শক্তি আরও বাড়াচ্ছে বেজিং। বাণিজ্যিক উপগ্রহের ছবিতে দেখা গিয়েছে, ভারতের সীমান্তের বিপরীতে অবস্থিত চিনের দুটি বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১২টি অত্যাধুনিক J-20 স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC বরাবর চিনের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের অন্যতম বৃহত্তম সমাবেশ হিসেবে এই মোতায়েনকে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্যিক উপগ্রহ সংস্থা ভ্যান্টর (Vantor)-এর তোলা ছবিতে চিনের জিনজিয়াংয়ের হোটান বিমানঘাঁটি এবং তিব্বতের ডামক্সুং বিমানঘাঁটিতে J-20 যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ছবি ধরা পড়েছে।
হোটান বিমানঘাঁটিতে ৮টি J-20 যুদ্ধবিমান
উপগ্রহের ছবিতে দেখা গিয়েছে, ৯ জুলাই হোটান বিমানঘাঁটির টারমাকে আটটি J-20 'মাইটি ড্রাগন' স্টিলথ যুদ্ধবিমান দাঁড়িয়ে রয়েছে। চিনের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত এই বিমানঘাঁটিটি অসামরিক এবং সামরিক—দুই কাজেই ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় সীমান্তের তুলনায় হোটান বিমানঘাঁটির অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি উত্তর লাদাখের দৌলত বেগ ওল্ডি (DBO) সেক্টর থেকে প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার এবং লেহ থেকে প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ডামক্সুং বিমানঘাঁটিতেও J-20-এর উপস্থিতি
অন্যদিকে, ২৫ জুনের উপগ্রহ চিত্রে তিব্বতের লাসা এলাকার ডামক্সুং বিমানঘাঁটিতে আরও চারটি J-20 যুদ্ধবিমান দেখা গিয়েছে। ছবিতে বিমানগুলিকে ক্যানোপি কভারে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। ডামক্সুং বিমানঘাঁটিটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং থেকে প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। অর্থাৎ, প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চিনের এই দুটি সীমান্তবর্তী বিমানঘাঁটিতে মোট ১২টি J-20 স্টিলথ যুদ্ধবিমান শনাক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত-সীমান্তবর্তী চিনা বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে এত সংখ্যক J-20 মোতায়েনের ঘটনা খুব বেশি দেখা যায়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ চিনের J-20 যুদ্ধবিমান মোতায়েন?
J-20 চিনের অন্যতম প্রধান স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স বা PLAAF-এর সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর বিশেষ নকশা বা এয়ারফ্রেম রাডারে শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সূত্রের মতে, ভারত-সীমান্তবর্তী উঁচু বিমানঘাঁটিগুলিতে বারবার J-20 যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। তাঁদের ধারণা, সীমান্ত এলাকায় এই ধরনের যুদ্ধবিমান মোতায়েন এখন আর কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার কারণে নেওয়া সাময়িক পদক্ষেপ নয়। বরং এটি চিনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশলের একটি নিয়মিত অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের জন্য কেন উদ্বেগের?
চিনের এই সামরিক তৎপরতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারতীয় বায়ুসেনা তাদের যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের সংখ্যা কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি LCA Tejas Mk1A যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিলম্ব হয়েছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত Rafale যুদ্ধবিমান-সহ ১১৪টি মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত চুক্তিতে পরিণত হয়নি। ফলে সীমান্তের কাছে চিনের অত্যাধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বৃদ্ধি ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
চিনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বড় পরিকল্পনা
আগের উপগ্রহ চিত্রগুলিতে ভারত-সীমান্তবর্তী এই বিমানঘাঁটিগুলিতে J-20 যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক ছবিগুলি থেকে ইঙ্গিত মিলছে, চিন সামনের সারির বিমানঘাঁটিগুলিতে স্টিলথ যুদ্ধবিমানের মোতায়েন বাড়াচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ PLAAF-এর আধুনিকীকরণ এবং জিনজিয়াং ও তিব্বতে সামরিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। ভারত ও চিনের মধ্যে প্রায় ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতর্কিত সীমান্ত রয়েছে। ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর থেকেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর উত্তেজনা বজায় রয়েছে। যদিও দুই দেশ একাধিক দফায় সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা করেছে এবং বেশ কিছু সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার বা disengagement সম্পন্ন হয়েছে, তবুও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর উভয় দেশই বিপুল সংখ্যক সেনা, সাঁজোয়া যান এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি চিনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে অন্তত ১২টি J-20 স্টিলথ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি নতুন করে নজর কেড়েছে।
FAQ এর জন্য প্রশ্নোত্তর
১. চিনের J-20 যুদ্ধবিমান কী?
J-20 চিনের তৈরি একটি পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান। এটি চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স বা PLAAF-এর অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান।
২. ভারতের সীমান্তের কাছে কতগুলি J-20 যুদ্ধবিমান দেখা গিয়েছে?
বাণিজ্যিক উপগ্রহের ছবিতে ভারতের সীমান্তের কাছে চিনের দুটি বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১২টি J-20 যুদ্ধবিমান শনাক্ত করা হয়েছে।
৩. কোথায় J-20 যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে?
উপগ্রহের ছবিতে জিনজিয়াংয়ের হোটান বিমানঘাঁটিতে আটটি এবং তিব্বতের ডামক্সুং বিমানঘাঁটিতে আরও চারটি J-20 যুদ্ধবিমান দেখা গিয়েছে।
৪. হোটান বিমানঘাঁটি ভারতের কতটা কাছে?
হোটান বিমানঘাঁটি উত্তর লাদাখের দৌলত বেগ ওল্ডি সেক্টর থেকে প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার এবং লেহ থেকে প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
৫. ডামক্সুং বিমানঘাঁটি ভারতের কোন এলাকার কাছে?
তিব্বতের ডামক্সুং বিমানঘাঁটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং থেকে প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
৬. কেন J-20 যুদ্ধবিমানের এই মোতায়েন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিরক্ষা সূত্রের মতে, ভারত-সীমান্তবর্তী চিনা বিমানঘাঁটিতে J-20-এর বারবার উপস্থিতি সীমান্ত এলাকায় চিনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশলের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এই মোতায়েনের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
৭. ভারত-চিন সীমান্তে বর্তমানে কী পরিস্থিতি?
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্তে উত্তেজনা রয়েছে। একাধিক দফায় সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা এবং কিছু এলাকায় disengagement হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর দুই দেশই উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।