আফগানিস্তানের কুনার ও হেলমান্দ প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। রাষ্ট্রসংঘের মিশন (UNAMA) এই খবরের সত্যতা স্বীকার করেছে। অন্যদিকে, আফগান সরকার এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে কড়া নিন্দা করেছে।
পাকিস্তান ফের আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে। আর এই হামলায় শিশুসহ বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হওয়ায় পাকিস্তানের আসল রূপটা আবার সবার সামনে চলে এল। আফগানিস্তানের কুনার ও হেলমান্দ প্রদেশে পাকিস্তানের সেনার এই বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।
আফগানিস্তানে ইসলামাবাদের এই ধরনের সীমান্ত পেরিয়ে হামলায় বারবার সাধারণ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। আর এই বিষয়টি নিয়ে ফের আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। আফগানিস্তানে রাষ্ট্রসংঘের অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন (UNAMA) এক্স (X) হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে এই হতাহতের কথা জানিয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে যে, এই সামরিক হামলায় ৯ জন আহতও হয়েছেন।
ওই পোস্টে লেখা হয়েছে, "UNAMA নিশ্চিত করেছে যে আজ সকালে #Afghanistan-এর কুনার ও হেলমান্দ প্রদেশে হওয়া বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। এছাড়া ৯ জন আহত হয়েছেন।" দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমান্তে যখন উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে, ঠিক তখনই এই হামলার ঘটনা ঘটল। আফগান সরকার এদিন সকালেই জানিয়েছিল যে, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।
আফগান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ একটি বিবৃতি শেয়ার করেছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, কুনার ও হেলমান্দ প্রদেশের আবাসিক এলাকাগুলোকে টার্গেট করে এই ধ্বংসাত্মক বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে তিনটি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সেনার এই আগ্রাসনের ফলে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে প্রধান মুখপাত্র জানিয়েছেন, নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন।
এই অযৌক্তিক সামরিক হামলার কড়া নিন্দা করে মুজাহিদ বলেন, "আমরা এই কাজটিকে একটি আগ্রাসন এবং সমস্ত স্বীকৃত নীতির পরিপন্থী অপরাধ হিসেবে দেখছি এবং এর তীব্র নিন্দা করছি।"
সীমান্ত পেরিয়ে আগ্রাসনের ছক
পাকিস্তানের এই প্রাণঘাতী হামলাগুলো তাদের শত্রুভাবাপন্ন সামরিক পদক্ষেপেরই একটা অংশ। দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিবাদের জেরে এই বছরের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। আর তারপর থেকেই পাকিস্তান বারবার স্বাধীন আফগান ভূখণ্ডের ভেতরে বিনা অনুমতিতে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের যুক্তি
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার আফগানিস্তানের ১০টি জায়গায় নিখুঁত বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।
ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারার এক্স-এ একটি পোস্টে জানিয়েছেন যে, একদিন আগে আফগানিস্তান থেকে ড্রোন ছোঁড়া হয়েছিল। আর তারই জবাবে এই সাম্প্রতিক হামলাগুলো চালানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যেসব জায়গা থেকে ড্রোন ছোঁড়া হয়েছিল এবং যেখানে ড্রোনগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, সেগুলোকেই টার্গেট করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, ড্রোন হামলার চেষ্টার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তারারের পোস্টে লেখা ছিল, "আত্মরক্ষার সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ১০টি জায়গায় নিখুঁত বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই জায়গাগুলো ড্রোন ছোঁড়া এবং মজুত করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।"
আগের হামলা এবং আফগানিস্তানের জবাব
এর কয়েকদিন আগেই আফগানিস্তানের কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলায় তিন জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। টোলো নিউজ (TOLOnews)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ভোরে পাকতিকা প্রদেশের বারমাল জেলার রাখা এবং তোরকান্দি এলাকায় দুটি আলাদা হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে, কুনারে আরেকটি হামলায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
এরপরই আফগান সরকার পাকিস্তানের সেনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এলাকায় হামলা চালানোর অভিযোগ তোলে। তারা এই হামলাগুলোকে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে 'অপরাধ'-এর পুনরাবৃত্তি বলে বর্ণনা করেছে। পাশাপাশি, পাকিস্তানের এই বিমান হামলার 'উপযুক্ত জবাব' দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে আফগান সরকার। এক্স-এ একটি পোস্টে সরকারি মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানান, কুনারে তিন জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং চার জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পাকতিকায় হামলায় একটি বাড়ি এবং একটি স্থানীয় দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পাকতিকার ঘটনায় কোনও হতাহতের খবর নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, “আমরা এই আগ্রাসন ও নিপীড়নের নিন্দা জানাই এবং একে অপরাধের পুনরাবৃত্তি বলে মনে করি। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই ফের এই ধরনের অপরাধ করেছে। ঈশ্বর চাইলে আফগানরা এই আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেবে।”


