রাজস্থানের যোধপুরে চলছে 'তরঙ্গ শক্তি' মহড়া। সেখানেই ভারতের দেশি যুদ্ধবিমান তেজসের ভূয়সী প্রশংসা করলেন ফরাসি এয়ার ডিফেন্সের ডেপুটি কমান্ডার জুলিয়েন সাবেনে। তেজসকে তিনি ফরাসি মিরাজ ২০০০-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের আত্মনির্ভরতার দারুণ প্রশংসা করলেন ফরাসি এয়ার ডিফেন্সের ডেপুটি কমান্ডার জুলিয়েন সাবেনে। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি যুদ্ধবিমান 'তেজস'-এর ইঞ্জিন ও ওড়ার ক্ষমতা দেখে তিনি মুগ্ধ।

তেজস দেখে ফিরল মিরাজের স্মৃতি

এএনআই-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সাবেনে জানান, তেজসের সঙ্গে আকাশে ওড়ার সময় তাঁর ফরাসি ডেল্টা-উইং ফাইটার 'মিরাজ ২০০০'-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি নিজে একসময় মিরাজ ২০০০-এর পাইলট ছিলেন। তিনি বলেন, "তেজস একদম নতুন। আমার এটা খুব ভালো লেগেছে কারণ এটা আমাকে মিরাজ ২০০০-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। ফরাসি বায়ুসেনায় যখন আমি সক্রিয় ফাইটার পাইলট ছিলাম, তখন ওটাই ছিল আমার বিমান।"

ভারতের দেশীয় প্রযুক্তির উন্নতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "ফ্রান্সের মতোই ভারতও একটি স্বাধীন দেশ। ভারত যে নিজেদের যুদ্ধবিমান, ইঞ্জিন তৈরি করতে পেরেছে এবং সেটা নিজেরাই ওড়াচ্ছে, এটা দেখে আমার দারুণ লাগছে।"

তিনি জানান, দুই দেশের বায়ুসেনা এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নিজেদের সম্পর্ক আরও মজবুত করছে। "এখনও পর্যন্ত দুই বিমানের মধ্যে বোঝাপড়া বেশ ভালো। আমরা বিভিন্ন সরঞ্জামের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা বাড়াচ্ছি। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো একে অপরকে চেনা। যোধপুরে দুই দেশের পাইলটরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করছেন, নিজেদের বিমান নিয়ে কথা বলছেন। একসঙ্গে আরও ভালো কাজ করার এটাই সেরা উপায়।"

দুই দেশের বায়ুসেনার সম্পর্ক যে কয়েক দশকের পুরোনো, সে কথাও মনে করিয়ে দেন সাবেনে।

ভারত-ফ্রান্স যুদ্ধ বিমান সহযোগিতা

"১৯৫২ সালে 'উরাগান' (Ouragan) দিয়ে শুরু। সেই ৫০-এর দশক থেকেই ভারতীয় বায়ুসেনার কাছে ফরাসি সরঞ্জাম রয়েছে। এখন তো ভারতীয় বায়ুসেনা বেশ কয়েক বছর ধরে রাফালও ব্যবহার করছে। এটা দারুণ ব্যাপার, কারণ আমরা নিজেদের সেরা অভিজ্ঞতাগুলো একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।"

তিনি জানান, দুই দেশের বায়ুসেনাই যুদ্ধের ময়দানে রাফাল ব্যবহার করেছে। আর এই অভিজ্ঞতা দুই পক্ষের জন্যই খুব দামি।

"ভারতীয় বায়ুসেনা যুদ্ধে রাফাল উড়িয়েছে, আমরাও উড়িয়েছি। তাই যুদ্ধ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো সত্যিই খুব আকর্ষণীয়। 'তরঙ্গ শক্তি'-র মতো এত বড় একটা মহড়ায় আমরা সেই অভিজ্ঞতাগুলোই একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি।"

রাফাল ইস্যুতে ফরাসি এয়ার জেনারেলের প্রতিক্রিয়া

দুই দেশের ফ্লিটের একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, "রাফালের সঙ্গে আমরা দারুণ বোঝাপড়া দেখেছি। শুধু তাই নয়, আমরা দেখেছি যে আপনাদের ট্যাঙ্কার থেকে আমরা বিমানে জ্বালানি ভরতে পারি, আবার উল্টোটাও সম্ভব।"

এই মহড়ার জন্য ফরাসি দলে রয়েছে সাতটি রাফাল, তিনটি এমআরটিটি (MRTT) এবং দুটি এ৪০০এম (A400M) বিমান।

তিনি বলেন, "আজ সকালে আমি একটি এ৪০০এম বিমানে পর্যবেক্ষক হিসেবে উড়ছিলাম। বিমানটি মাঝ আকাশে রাফালকে জ্বালানি দিচ্ছিল, আর পুরো কাজটা একদম নিখুঁতভাবে হয়েছে।"

ফ্রান্সের দূরপাল্লার মিশন 'পেগাস ২৬' (PEGASE 26) সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাবেনে জানান, এই মিশনটি এখনও পর্যন্ত পাঁচটি আলাদা দেশে থেমেছে।

"আমাদের কাছে 'তরঙ্গ শক্তি' মহড়ার জন্য এখানে থামাটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার। কারণ এটা সত্যিই একটা বড় মাপের বহুজাতিক মহড়া, যা আমাদের আগামী দিনের যুদ্ধের জন্য সেরা ট্রেনিং দিচ্ছে।"

২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত যোধপুরে চলছে 'তরঙ্গ শক্তি' মহড়া। সেখানেই অংশ নিয়েছে ফ্রান্স।

এই মহড়ার থিম হলো “পাওয়ার ইন পার্টনারশিপ” (Power in Partnership)। একসঙ্গে কাজ করা, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং বন্ধু দেশগুলোর বায়ুসেনার মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপরই এখানে জোর দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, এই মহড়ায় সাতটি বন্ধু দেশ অংশ নিচ্ছে— অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ফ্রান্স, জার্মানি, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ।

এই মহড়ায় অংশ নেওয়া বিদেশি বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে এফ-৩৫ লাইটনিং টু (F-35 Lightning II), রাফাল, এফ-১৬, এ৪০০এম, এমআরটিটি, সি-১৩০, সি-১৩০জে এবং কেসি-৩০এ। এর ফলে যুদ্ধ, এয়ারলিফট এবং মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার মতো নানা ক্ষমতার এক দারুণ মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে।