
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বৃহত্তর শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে তাদের কাছে মজুত থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন দু'জন মার্কিন কর্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন যে ওয়াশিংটন ও তেহরান এমন একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, যার লক্ষ্য হল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। যদিও ট্রাম্প প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করেননি। তবুও মার্কিন কর্তারা সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছেন যে, তেহরান নীতিগতভাবে তাদের কাছে মজুত থাকা 'অস্ত্র-গ্রেড' বা পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রার কাছাকাছি মানের ইউরেনিয়াম ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে।
তবে মার্কি কর্তারা জানান, এই পর্যায়ে এসে সমঝোতাটি এখনও বেশ সাধারণ বা প্রাথমিক রূপেই রয়ে গেছে। ইউরেনিয়াম কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে—তার সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি নিয়ে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি। বৃহত্তর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরমাণু আলোচনার পরবর্তী কোনও ধাপে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যেখানে ঠিক করা হবে ইরান কীভাবে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করবে, এর ঘনত্ব কমিয়ে ফেলবে (dilute), কিংবা অন্য কোনও উপায়ে এটিকে নিষ্ক্রিয় করবে।
যদিও, সম্প্রতি ইরানি সূত্রগুলো দাবি করেছিল যে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইউরেনিয়ামের এই মজুত দেশের বাইরে পাঠানো না হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তথ্যমতে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ। যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রার (weapons-grade) অত্যন্ত কাছাকাছি একটি স্তর। ইজরায়েল বারবারই এই যুক্তি দিয়ে আসছে যে, এই মজুতকে আরও পরিশোধন করে একাধিক পরমাণু বোমা তৈরির উপযোগী উপাদান প্রস্তুত করা সম্ভব।
আলোচনার পুরো প্রক্রিয়ায় এই বিষয়টিই একটি প্রধান 'বাধার কারণ' বা অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। জানা গেছে, ইরানি আলোচকরা জোর দিচ্ছিলেন যেন ইউরেনিয়াম মজুত সংক্রান্ত যে কোনও প্রতিশ্রুতি আলোচনার পরবর্তী কোনও ধাপ পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু মার্কিন কর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই দাবিতে অটল ছিল যে—প্রাথমিক চুক্তিতেই তেহরানকে অন্তত একটি প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। অন্যথায় আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে এবং সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হতে পারে—এমন হুঁশিয়ারিও তারা দিয়েছিল।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত করা জায়গায় হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। ধারণা করা হয়, এই ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ ইসফাহান পরমাণু স্থাপনার ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে মজুত রাখা আছে। উল্লেখ্য, গত বছর মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এই জায়গাটি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আলোচনার টেবিলে যেসব বিকল্প পরিকল্পনার কথা উঠেছিল, তার মধ্যে একটি ছিল ভূগর্ভে লুকানো এই মজুত ধ্বংস করার জন্য 'বাঙ্কার-বাস্টিং বোমা' ব্যবহার করা।
সংবাদপত্রটি আরও দাবি করেছে যে, আলোচনার এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একটি যৌথ মার্কিন-ইজরায়েলি কমান্ডো অভিযানের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করেছিলেন—যার উদ্দেশ্য ছিল ইউরেনিয়ামের মজুতটি জবরদখল করা। বিশেষ করে যখন দেখা গেল যে, পূর্ববর্তী হামলার পরেও ইরান পুনরায় ওই ইউরেনিয়াম মজুতের উপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার ফিরে পেয়েছে। তাই উচ্চ ঝুঁকির কারণে শেষ পর্যন্ত এই অভিযানের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
আলোচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য পথ ২০১৫ সালের চুক্তির মতো। যা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে হয়েছিল। সেই সময় ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল একটি অংশ রাশিয়ায় হস্তান্তর করেছিল। আরেকটি বিকল্প হতে পারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমিয়ে ফেলা, যাতে এটি অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
আলোচনার পরবর্তী ধাপেও ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ভবিষ্যতের উপরই মূলত আলোকপাত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও আমেরিকা সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের উপর দীর্ঘমেয়াদী স্থগিতাদেশ চেয়েছে বলে জানা গেছে, তবে ইরান এর তুলনায় অনেক কম সময়ের একটি সময়সীমা প্রস্তাব করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের শত কোটি ডলারের সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।