যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো বোঝাপড়া হয়নি, সাফ জানিয়ে দিল ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে তেহরান কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এই খবর জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চললেও এখনও চূড়ান্ত কোনো বোঝাপড়া হয়নি। বাইরের কোনো চাপের মুখে তেহরান কাজ করবে না, এই কথা জানিয়ে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে যে, তারা আমেরিকার দাবি প্রত্যাখ্যান করছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরকারি টেলিভিশনকে বলেন, "তেহরান ৪৭ বছর আগেই 'করতেই হবে' এই ধমকের ভাষাকে বিদায় জানিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো পক্ষই ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের সঙ্গে কথা বলার সময় এই 'করতেই হবে' ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। আমরা আমাদের দেশের মানুষের স্বার্থ ও অধিকারের কথা মাথায় রেখেই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিই।"

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছিলেন যে হরমুজ প্রণালীতে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হচ্ছে এবং ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়ে শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তার এই মন্তব্যের পরেই ইরানের পক্ষ থেকে এই জবাব এল। ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমাদের অভাবনীয় ও নজিরবিহীন নৌ অবরোধের কারণে প্রণালীতে আটকে থাকা জাহাজগুলো এবার 'বাড়ির দিকে রওনা' দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে! আমার তরফ থেকে আপনাদের স্ত্রী, স্বামী, বাবা-মা এবং পরিবারের সবাইকে হ্যালো বলবেন, আমি আপনাদের প্রিয় প্রেসিডেন্ট!"
বাঘাই আমেরিকার এই সামুদ্রিক পদক্ষেপকে "শুরু থেকেই বেআইনি" বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই পদক্ষেপ ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করেছে, জানিয়েছে প্রেস টিভি।
তিনি বলেন, "ওরা সত্যিই ওদের কথা রাখবে, নাকি এটা শুধু একটা প্রচারের কৌশল, তা আমাদের বাস্তবে দেখতে হবে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, এই পদক্ষেপগুলো প্রত্যাহার করার অর্থ হলো এমন একটি কাজ বন্ধ করা যা "প্রথম থেকেই করা উচিত হয়নি।"
ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর এবং ইরানের জাহাজ ও বন্দরকে লক্ষ্য করে মার্কিন পদক্ষেপের পর ইরান হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছিল।
বাঘাই বলেন, তেহরান আমেরিকার এই পদক্ষেপকে যুদ্ধবিরতির শর্তের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করে এবং দাবি করেন যে ওয়াশিংটন একতরফাভাবে কিছু পদক্ষেপ বাড়িয়েছে। তিনি আরও জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। এই আলোচনায় মূলত সংঘাত বন্ধ করা, সামুদ্রিক সমস্যা সমাধান এবং বিদেশে ইরানের সম্পদ সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা হচ্ছে।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কথা বলতে গিয়ে বাঘাই বলেন, "পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আমাদের কোনো আলোচনাই হচ্ছে না।"
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার দাবি করেছেন যে আমেরিকা তেহরানকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে পারবে না। হরমুজ প্রণালীর কথা উল্লেখ করে বাঘাই বলেন, এই জলপথটি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা থাকা দরকার যা উভয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
তবে, আমেরিকা এর আগে ওমানকে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সঙ্গে মিলে কোনো শুল্ক ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে সতর্ক করেছিল। ওয়াশিংটন জানিয়েছিল যে তারা এই ধরনের প্রচেষ্টা সহ্য করবে না এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। পরে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানান যে ওমান তাকে আশ্বস্ত করেছে যে ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক বসানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই এবং তারা দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন যে আমেরিকার "কোনো গ্যারান্টি বা কথার ওপর ইরানের বিশ্বাস নেই"। তিনি জানান, যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভাগ্য শুধুমাত্র কাজের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
তিনি বলেন, "আমরা আলোচনার মাধ্যমে নয়, মিসাইলের জোরে ছাড় আদায় করি; আলোচনায় বসে শুধু তাদের সেটা বুঝিয়ে দিই। আমাদের গ্যারান্টি বা কথার ওপর কোনো বিশ্বাস নেই—একমাত্র কাজই হলো মাপকাঠি। অপর পক্ষ কোনো পদক্ষেপ না করার আগে আমরাও কিছু করব না। যেকোনো চুক্তির আসল বিজয়ী তো সেই, যে চুক্তির পরের দিন থেকেই যুদ্ধের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত থাকে।"


