
হরমুজ প্রণালীর সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধের মেঘ ঘনাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE) দাবি করেছে, ইরান থেকে ছোড়া ১৫টা মিসাইল আর ৪টে ড্রোন তারা মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এর জন্য তারা নিজেদের অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করেছে। এই হামলায় বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর না থাকলেও, গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে একটা ভয় আর অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটা শুধু একটা সামরিক ঘটনাই নয়, বরং একটা বড় ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের অশনি সংকেত।
এই ঘটনার পর UAE, সৌদি আরব, কাতার-সহ উপসাগরীয় দেশগুলো হাই অ্যালার্ট জারি করেছে। সামরিক তৎপরতা বেড়েছে এবং পাল্টা হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা আঁটসাঁট করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এই অঞ্চল এখন আর শুধু কূটনীতির ওপর ভরসা করে নেই, বরং সামরিক প্রস্তুতির দিকেই এগোচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রুটগুলোর মধ্যে অন্যতম হরমুজ প্রণালী এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে কোনও রকম সংঘাত হলে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই খবর আসছে, কয়েকশো জাহাজ এই এলাকায় আটকে পড়েছে এবং বাণিজ্যিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। একটি মালবাহী জাহাজে "অজ্ঞাত বস্তু" দিয়ে হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজে চলা সামরিক অভিযান “প্রজেক্ট ফ্রিডম” হঠাৎ করেই থামিয়ে দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে আলোচনার খবরের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও আমেরিকা এটাকে একটা আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলছে, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত আসলে কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক সমীকরণেরই ফল।
এরই মধ্যে, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির চিন সফর একটা নতুন কৌশলগত দিকের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত চিন সফরের ঠিক আগেই এই সফর হচ্ছে, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো এই সংঘাতে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হল, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কি উত্তেজনা কমাবে, নাকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে?
মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটা সংবেদনশীল ফ্রন্ট, ইজরায়েল আর হেজবোল্লার মধ্যেও উত্তেজনা কমেনি। সম্প্রতি দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনার ওপর রকেট হামলা হয়, যার জবাবে ইজরায়েলও বিমান হানা চালায়। যদিও বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে ১৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও ঘরছাড়া, যা এক মানবিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে।
মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতে, পারস্য উপসাগরে প্রায় ২৩,০০০ নাবিক আর কয়েকশো জাহাজ আটকে পড়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করছে না, বিশ্ব বাণিজ্য এবং সাপ্লাই চেইনের ওপরেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শিপিং কোম্পানিগুলো এখনও ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক।
ইরান অবশ্য UAE-র ওপর মিসাইল হামলার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে একে "ভিত্তিহীন" বলেছে। একই সঙ্গে, তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, UAE-র মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনও ধরনের সামরিক হামলা হলে তার "কড়া জবাব" দেওয়া হবে। এই বয়ান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন আধিকারিক মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, আমেরিকার মূল সামরিক অভিযান “অপারেশন এপিক ফিউরি” তার লক্ষ্য পূরণ করেছে। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এর মানে এই নয় যে সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল, যেখানে প্রত্যেকটা ঘটনা একটা বড় সংঘাতের দিকেই ইঙ্গিত করছে। কূটনীতি, সামরিক শক্তি আর বিশ্ব রাজনীতির এই খেলায় আগামী দিনগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। আপাতত গোটা বিশ্বের নজর এখন হরমুজ আর উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে—কারণ এখানকার সামান্য একটা ঢেউও বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।