স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে স্ত্রীর বাপের বাড়ি চলে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু অনেক সময় স্ত্রী দীর্ঘদিন সেখানেই থেকে যান। এখন প্রশ্ন হলো, স্ত্রী যদি টানা এক বছর বাপের বাড়িতে থাকেন, তাহলে স্বামী কি ডিভোর্স চাইতে পারেন?
শুধু বাপের বাড়িতে থাকাই ডিভোর্সের কারণ হতে পারে না
স্ত্রী এক বছর বাপের বাড়িতে থাকলেই স্বামী সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্স পেয়ে যাবেন, এমনটা বলা যায় না। আদালত সবার আগে দেখবে, স্ত্রী কেন বাপের বাড়ি গেছেন। স্বামীর সঙ্গে না থাকার পেছনে কি কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে? স্বামীর অত্যাচার, গার্হস্থ্য হিংসা, পণের চাপ বা নিরাপত্তার অভাবের মতো কারণে স্ত্রী আলাদা থাকলে আদালত সেটা অবশ্যই বিবেচনা করবে। তাই শুধু 'স্ত্রী এক বছর ধরে বাপের বাড়িতে আছে'—এই যুক্তিতে ডিভোর্স পাওয়া যায় না। তবে স্ত্রী যদি বিনা কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীকে ছেড়ে চলে যান, তখন সেটাকে 'পরিত্যাগ' বা ডেজার্শন (Desertion) হিসেবে ধরা হতে পারে।
25
'পরিত্যাগ' প্রমাণ করতে পারলে ডিভোর্স মিলতে পারে
১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইনের ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, 'পরিত্যাগ' বা ডেজার্শন (Desertion) ডিভোর্সের একটি অন্যতম কারণ। এর মানে হলো, কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া এবং পার্টনারের সম্মতি ছাড়াই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা। তবে এখানে একটা বড় ব্যাপার আছে। আইন বলছে, ডিভোর্সের মামলা করার আগে পার্টনারকে অন্তত টানা দু'বছর আলাদা থাকতে হবে। তাই স্ত্রী মাত্র এক বছর বাপের বাড়িতে থাকলেই 'পরিত্যাগ'-এর যুক্তিতে ডিভোর্স চাওয়া যায় না। পাশাপাশি, স্ত্রীর আলাদা থাকার পেছনে কোনও আইনি কারণ আছে কি না, সেটাও আদালত খতিয়ে দেখে।
35
মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা হয়
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চরম অশান্তি থাকলে 'মানসিক নিষ্ঠুরতা' (Mental Cruelty)-ও ডিভোর্সের একটা কারণ হতে পারে। তবে স্ত্রী শুধু বাপের বাড়িতে থাকলেই সেটা মানসিক নিষ্ঠুরতা হয়ে যায় না। উদাহরণস্বরূপ, স্ত্রী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীকে ক্রমাগত হয়রানি করেন, অপমান করেন বা মিথ্যা অভিযোগ আনেন, তবে আদালত সেটা বিবেচনা করতে পারে। একইভাবে, স্বামীর অত্যাচারের কারণে স্ত্রী আলাদা থাকলে, স্বামী উল্টে স্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার অভিযোগ আনতে পারেন না। স্বামীকে আদালতে নিজের দাবির সপক্ষে প্রমাণ পেশ করতে হয়। শুধু মুখের কথায় কাজ হয় না; পরিস্থিতি, মেসেজ, অভিযোগপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ এই ধরনের মামলায় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্ত্রী যদি বিনা কারণে স্বামীর থেকে দূরে থাকেন, তবে সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্সের মামলা করাই একমাত্র রাস্তা নয়। হিন্দু বিবাহ আইনের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের (Restitution of Conjugal Rights) জন্য স্বামী আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। এই পিটিশনের মাধ্যমে স্বামী আদালতকে অনুরোধ করতে পারেন যাতে স্ত্রীকে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আদালত স্ত্রীকেও তাঁর বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেয়। স্ত্রী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তাঁর আলাদা থাকার পেছনে সঠিক কারণ রয়েছে, তবে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারে। আদালতের নির্দেশের পরেও যদি কোনও পার্টনার বিনা কারণে একসঙ্গে থাকতে অস্বীকার করেন, তবে ভবিষ্যতে ডিভোর্সের মামলায় সেটা একটা বড় হাতিয়ার হতে পারে।
55
ডিভোর্স চাইলে আদালতে সঠিক কারণ ও প্রমাণ থাকা জরুরি
স্ত্রী বাপের বাড়িতে থাকছেন বা স্বামীর সঙ্গে থাকছেন না—শুধু এইটুকু কারণেই নিজে থেকে ডিভোর্স হয়ে যায় না। যিনি মামলা করছেন, তাঁকে আইনে বলা নির্দিষ্ট কারণগুলো প্রমাণ করতে হয়। এছাড়া, বিয়ের পর এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত ডিভোর্সের মামলা করা যায় না। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি নিয়ে ছাড় পাওয়া যেতে পারে।
মোদ্দা কথা হলো, স্ত্রী এক বছর ধরে বাপের বাড়িতে আছেন, শুধু এই যুক্তিতে স্বামী সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্স পেয়ে যাবেন—এমনটা ভাবা ভুল। স্ত্রী কেন আলাদা থাকছেন, সেই কারণটা কতটা যুক্তিসঙ্গত, কতদিন ধরে আলাদা আছেন এবং দুজনের মধ্যে কী কী ঘটেছে—এই সব প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তাই এই ধরনের পরিস্থিতিতে একজন ফ্যামিলি ল-ইয়ারের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।