গুজরাটের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি বিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। বিজেপি একে নারী ক্ষমতায়নের বড় পদক্ষেপ বললেও, কংগ্রেসের দাবি, আসল সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতেই এই কৌশল।
গুজরাটের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি বিল ২০২৬-এ আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। এর ফলে রাজ্যে এই আইন চালুর পথ পরিষ্কার হয়ে গেল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী কংগ্রেসের মধ্যে জোর তরজা শুরু হয়েছে। বিলের উদ্দেশ্য এবং প্রভাব নিয়ে দুই দলের মত একেবারে আলাদা।
UCC বিল নিয়ে বিজেপির প্রতিক্রিয়া
বিজেপি রাষ্ট্রপতির এই অনুমোদনকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছে, নারী ক্ষমতায়ন এবং সমতার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। বিজেপি নেতা অনিল প্যাটেল জানান, রাষ্ট্রপতির সিলমোহর পড়ার অর্থ হলো গুজরাটে এখন ইউসিসি আইন কার্যকর হয়ে গেল। তিনি আরও বলেন, বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, লিভ-ইন সম্পর্ক এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো বিষয়গুলো আগে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা ছিল। নতুন এই আইন সেই বৈষম্য দূর করবে।
অনিল প্যাটেলের কথায়, "রাষ্ট্রপতি আজ ইউসিসি বিল ২০২৬-এ আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছেন। ফলে গুজরাটে এই আইন কার্যকর হলো। আমি এই আইনকে স্বাগত জানাই। রাজ্যে নারী ক্ষমতায়ন ও সমতা ফেরাতে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। বাবাসাহেব আম্বেদকরের মতো সংবিধান প্রণেতারা যখন সংবিধান রচনা করেছিলেন, তখন তাঁরা দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্ট করে বলেছিলেন। আজ গুজরাটে সেই লক্ষ্য পূরণ হলো।"
অন্যদিকে, কংগ্রেস এই ইউসিসি চালুর কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, বিধানসভায় বিলটি আনার আগে সরকারের উচিত ছিল গুজরাটের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলা।
UCC বিল নিয়ে কংগ্রেসের পাল্টা সওয়াল
গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি অমিত চাভদা বলেন, রাজ্য এখন বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, আদিবাসীদের অধিকার, তফসিলি জাতি ও সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষকদের আত্মহত্যার মতো একাধিক জ্বলন্ত আর্থ-সামাজিক সমস্যার মুখে দাঁড়িয়ে। তাঁর অভিযোগ, এই সব আসল সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই সরকার ইউসিসি-কে হাতিয়ার করছে।
অমিত চাভদা বলেন, "গুজরাটে যুবসমাজ বেকার, আর প্রশ্নফাঁস তো রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদিবাসীরা জঙ্গল ও জমির অধিকারের জন্য লড়ছেন। দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার বাড়ছে। মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, আর কৃষকরা আত্মঘাতী হচ্ছেন। সত্যি বলতে, আজ গুজরাটের প্রতিটি স্তরের মানুষ ভুগছেন। বিজেপি সরকার যখন বিধানসভায় এই বিল আনে, আমরা তখনই বলেছিলাম যে গুজরাটে নানা ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বাস। তাদের নিজস্ব রীতিনীতি ও বিশ্বাস রয়েছে। এই বিল সেগুলোর পরিপন্থী। আমরা দাবি করেছিলাম, বিল আনার আগে সব সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নেওয়া হোক।"
বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন কংগ্রেসের আপত্তির কথাও মনে করিয়ে দেন চাভদা। তিনি জানান, বিলটি নিয়ে যাতে রাজ্যজুড়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হয়, তার জন্য কংগ্রেস এটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি তুলেছিল।
তিনি আরও বলেন, "আমরা বিধানসভায় এই নিয়ে তর্ক করেছি এবং বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানিয়েছি। কিন্তু ওরা গায়ের জোরে বিলটি পাশ করিয়ে নেয়। এখন রাষ্ট্রপতি এতে সই করেছেন ঠিকই, কিন্তু আমি মনে করি এতে কোনও আদিবাসী, দলিত, ওবিসি বা সাধারণ গুজরাটির কোনও লাভ হবে না। সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা ঢাকতে এটা স্রেফ একটা নজর ঘোরানোর চেষ্টা। এতে গুজরাটের মানুষ বা কোনও পরিবারের বিন্দুমাত্র উপকার হবে না।"
চলতি বছরের মার্চ মাসে গুজরাট বিধানসভায় এই ইউসিসি বিল ২০২৬ পাশ হয়। সব সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষা দেওয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে খবর, এই বিলে বিয়ে, ডিভোর্স, লিভ-ইন সম্পর্ক, খোরপোষ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রাখা হয়েছে। মহিলাদের সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।
বিলটি পেশ করার সময় মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত' ভাবনারই প্রতিফলন এই বিল। জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের জন্য যে সবার জন্য সমান আইন জরুরি, সে কথাও জোর দিয়ে বলেছিলেন তিনি।


