
আগের বাঙালি বাবুরা ট্রাঙ্ক গুছিয়ে ধরতেন হাওড়া-জামালপুর এক্সপ্রেস। গন্তব্য? দেওঘর নয়, গিরিডি নয় – শিমুলতলা। ঝাড়খণ্ডের জামুই জেলার এই ছোট্ট স্টেশন ছিল ‘বাবুদের দার্জিলিং’। আজ একবিংশ শতকে এসি-মলের যুগে শিমুলতলা হারিয়েছে জৌলুস, কিন্তু ধরে রেখেছে আত্মা। বর্ষায় যখন মেঘ এসে ছোঁয় লাটু পাহাড়, যখন ধারারা ফলসে জল গড়ায়, তখন বোঝা যায় কেন বিভূতিভূষণ এখানে ‘আরণ্যক’ লিখেছিলেন। ২ দিনের ছুটি, ৭ ঘণ্টার ট্রেন – আর ফিরে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া বাংলা।
একসময় কলকাতার উকিল, ডাক্তার, জমিদাররা এখানে দোতলা-তিনতলা বাংলো বানাতেন। যক্ষা সারানোর জন্য হাওয়া বদল করতে আসতেন। আজ সেই বাংলোগুলোই শিমুলতলার পরিচয়। রাজবাড়ি, দেবেন্দ্র ভিলা, নন্দলাল ভিলা – নামগুলো শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয়। দেওয়ালে বটের শেকড়, ভাঙা ঝাড়বাতি, পরিত্যক্ত পিয়ানো। বর্ষার কুয়াশায় এই ধ্বংসস্তূপগুলোকে দেখলে মনে হবে টাইম মেশিনে চড়ে ১৯৩০-এ চলে এসেছেন।
শিমুলতলার সবচেয়ে বড় বাংলো এটা। লাল ইটের দেওয়াল, উঁচু সিলিং, ভাঙা বারান্দা। স্থানীয়রা বলে রাত ৮টার পর এখানে আলো জ্বলে। সত্যি-মিথ্যা জানি না, তবে দিনের বেলায় ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়ালে একশো বছরের গল্প আপনার লেন্সে ধরা পড়বেই। সাহেবি আমলের ফ্লোর টাইলস আজও অটুট।
স্টেশন থেকে ২ কিমি হাঁটলেই লাটু পাহাড়। ওপরে উঠলে গোটা শিমুলতলা হাতের তালুতে। বর্ষায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে ছোট ছোট ঝর্ণা। আর ৪ কিমি দূরে ধারারা ফলস – ১৪৭ ফুট উপর থেকে জল পড়ছে সজোরে। ভিজে মাটির গন্ধ, শাল পাতার শব্দ – শহরের সব ক্লান্তি ধুয়ে যাবে।
শিমুলতলা মানেই জঙ্গল। স্টেশনের পাশ দিয়েই চলে গেছে রেললাইন। লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে দু’পাশে শুধু শাল আর পিয়াল গাছ। সকালবেলা হাঁটলে হরিণের দেখা মিলতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, গাড়ির হর্ন নেই – শুধু পাখির ডাক আর আপনার নিঃশ্বাস।
কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন?যাওয়া: হাওড়া থেকে হাওড়া-জামালপুর এক্সপ্রেস সকাল ৭:১০। দুপুর ১:০৫-এ শিমুলতলা স্টেশন। ফেরা বিকেল ৩:২৫-এর একই ট্রেন। মোট ৭-৮ ঘণ্টা জার্নি।
থাকা: এসি-সুইমিং পুল ভুলে যান। থাকুন রাজবাড়ি বাংলো বা DFO বাংলোতে। ভাড়া ৮০-১২০০ টাকা। পাখা, কমন বাথরুম – তবু অভিজ্ঞতাটা ১০ বছরের পুরোনো।
খাওয়া: স্টেশনের ‘শিমুলতলা হোটেল’-এ বাঙালি থালি। আলু-পরোটা, ডাল-ভাত। সাথে শুকনো খাবার, ওষুধ রাখা মাস্ট।
প্রথমত, সন্ধে ৭টার পর স্টেশনের বাইরে বেরোবেন না। জঙ্গল আর পরিত্যক্ত বাংলো – রাতে একা ঘোরা ঠিক না। দ্বিতীয়ত, Jio ছাড়া নেটওয়ার্ক প্রায় নেই। অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে রাখুন। তৃতীয়ত, জঙ্গলে একা ঢুকবেন না। গাইড নিন, ২০০-৩০ টাকা নেবে।
দার্জিলিং-এ ভিড়, দিঘিতে কোলাহল। শিমুলতলা দেবে শান্তি। এখানে এসে বুঝবেন, ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, পুরোনো দিনকে ছোঁয়া। বিংশ শতকের বাবুরা এখানে এসে প্রাণ ফিরে পেতেন, আপনি আসুন মন ফিরে পেতে।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News