বাসন মাজা, ঘর মোছাও শেখান সন্তানকে, গবেষণা বলছে, ঘরের কাজই বানায় সফল মানুষ

Published : May 10, 2026, 10:23 PM IST
Why is it important to teach children housework Sensational information in research

সংক্ষিপ্ত

“আমার বাচ্চা পড়াশোনা করলেই হবে, ঘরের কাজ করে সময় নষ্ট কেন?” – এই ভেবে ছেলে-মেয়েকে বিছানা তোলা, জল ভরাও শেখান না? ৭৫ বছরের হার্ভার্ড গবেষণা বলছে, এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। যারা ছোটবেলায় ঘরের কাজ করেছে, তারাই বড় হয়ে সবচেয়ে সফল, সুখী ও ভালো বেতনের চাকরি পেয়েছে।

“তুই পড়তে বস, আমি বাসন মেজে দিচ্ছি।” “পরীক্ষা সামনে, ঘর আমিই গোছাব।” – মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির রোজের ডায়লগ। আমরা ভাবি, সন্তানকে ভালোবেসে ঘরের কাজ থেকে দূরে রাখছি। কিন্তু আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ৭৫ বছরের ‘Grant Study’ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই ‘ভালোবাসা’ আসলে সন্তানের কেরিয়ারের বারোটা বাজাচ্ছে। ১৯৩৮ সালে হার্ভার্ড ২৬৮ জন পুরুষ ছাত্রের উপর গবেষণা শুরু করে। ৭৫ বছর ধরে তাদের জীবন ট্র্যাক করা হয় – স্বাস্থ্য, চাকরি, বিয়ে, সুখ। ২০১৫ সালে রিপোর্ট বেরোয়।

গবেষণার চাঞ্চল্যকর ফলাফল কী?

স্টাডির ডিরেক্টর, সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. রবার্ট ওয়াল্ডিঙ্গার বলছেন, “সফল ও সুখী জীবনের দুটো প্রধান ফ্যাক্টর পেয়েছি। এক, ভালো সম্পর্ক। দুই, ছোটবেলায় ঘরের কাজ করা।” যারা ৩-৪ বছর বয়স থেকে বাড়িতে টুকটাক কাজ করত – খেলনা গোছানো, টেবিল মোছা, গাছে জল দেওয়া – তারাই ৩০ বছর বয়সে বেশি আত্মনির্ভরশীল, ভালো টিম প্লেয়ার, এবং বেশি রোজগার করেছে। মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির আরেক গবেষণা বলছে, ৩-৪ বছর বয়সে যারা ঘরের কাজ শুরু করে, তাদের ২০ বছর বয়সে ড্রাগ অ্যাডিকশন, ক্রাইম রেট, ভাঙা সম্পর্কের হার ৭০% কম। আর যারা টিনএজে কাজ শেখে, তাদের কোনও লাভ হয় না।

কেন ঘর মোছা, বাসন মাজা সফল মানুষ বানায়?

১. ‘এক্সিকিউটিভ ফাংশন’ তৈরি হয় – ব্রেনের CEO স্কিল

ঘরের কাজ মানে প্ল্যানিং, শুরু করা, শেষ করা, টাইম ম্যানেজমেন্ট। “আগে বিছানা গোছাব, তারপর জল ভরব, ৬টায় পড়তে বসব।” – এই স্কিলকেই বলে এক্সিকিউটিভ ফাংশন। বড় হয়ে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, ডেডলাইন, মাল্টিটাস্কিং – সব এখান থেকেই আসে। বই পড়ে এটা শেখা যায় না।

২. ‘আমি দরকারি’ – সেল্ফ-ওয়ার্থ বাড়ে

যখন ৫ বছরের বাচ্চা দেখে, ও টেবিল মুছল বলে সবাই একসাথে খেতে পারল, ওর ব্রেনে ডোপামিন রিলিজ হয়। “আমি পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ” – এই ফিলিং আত্মবিশ্বাস ১০ গুণ বাড়ায়। সারাদিন ‘ম্যাথ করো, ফার্স্ট হও’ বললে বাচ্চা ভাবে “আমি শুধু মার্কশিট”।

৩. এমপ্যাথি শেখে – টিম প্লেয়ার হয়

“মা একা সব কাজ করলে কষ্ট হয়। আমি হেল্প করি।” – এই বোধটাই এমপ্যাথি। গবেষণা বলছে, ঘরের কাজ করা বাচ্চারা বড় হয়ে ভালো বস, ভালো পার্টনার, ভালো বন্ধু হয়। কারণ ওরা ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ ভাবতে শেখে। IQ নয়, EQ বাড়ে।

৪. ‘গ্রিট’ তৈরি হয় – হাল না ছাড়ার জেদ

বাসন মাজতে ভালো লাগে না, তবু করতে হয়। এই ‘বোরিং কাজ’ করার অভ্যাস ব্রেনে ‘গ্রিট’ তৈরি করে। হার্ভার্ড বলছে, জীবনে সাফল্যের জন্য ট্যালেন্টের চেয়ে ‘গ্রিট’ ৩ গুণ বেশি দরকারি। UPSC, NEET ক্র্যাক করা, স্টার্টআপ চালানো – সবেতেই লাগে।

৫. ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি কমে

‘জার্নাল অফ ডেভেলপমেন্টাল অ্যান্ড বিহেভিওরাল পেডিয়াট্রিক্স’-এর রিপোর্ট, নিয়মিত ঘরের কাজ করা টিনএজারদের মধ্যে ডিপ্রেশন ২৫% কম। কারণ কাজ শেষের ‘সেন্স অফ অ্যাকমপ্লিশমেন্ট’ মন ভালো রাখে। ফোন ঘাঁটার চেয়ে ঘর মোছা বেশি অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট।

কোন বয়সে কী কাজ শেখাবেন? বয়স-ভিত্তিক চার্ট

২-৩ বছর: খেলনা বাস্কেটে ভরা, বই তাকে রাখা, গাছে জল দেওয়া। ‘হেল্প’ বলুন, ‘কাজ’ নয়।

৪-৫ বছর: নিজের বিছানা গোছানো, খাওয়ার পর প্লেট সিঙ্কে রাখা, জামা ভাঁজ করা, পোষ্যকে খাবার দেওয়া।

৬-৮ বছর: ঘর ঝাঁট দেওয়া, টেবিল মোছা, জামাকাপড় আলনায় রাখা, সবজি ধোয়া।

৯-১২ বছর: বাসন মাজা, ভাত বসানো, বাজার থেকে ছোট জিনিস আনা, ছোট ভাইবোনকে দেখা।

১৩+ বছর: রান্নায় হেল্প, বাথরুম পরিষ্কার, কাপড় কাচা, বাজেট প্ল্যানিং-এ হেল্প।

৩টে ভুল একদম নয়:

১. টাকা দিয়ে কাজ করানো: “ঘর মুছলে ১০ টাকা।” এটা চাকরি নয়। পরিবারের কাজ সবাই মিলে করে, টাকার জন্য নয়। পুরস্কার দিন – একসাথে সিনেমা, পছন্দের রান্না।

২. পারফেকশন চাওয়া: বাচ্চা ঘর মুছে দাগ রেখেছে? “বাহ, অনেক হেল্প হল” বলুন। “এটা কী করেছিস” বললে আর করবে না।

৩. ছেলে-মেয়ে ভেদ: “মেয়ে বলে রান্না শেখ” – এই যুগ আর নেই। ছেলেকেও রান্না, মেয়েকেও বাজার শেখান। লাইফ স্কিল জেন্ডার দেখে না।

কীভাবে শুরু করবেন? ৩টে ট্রিক

১. ‘ফ্যামিলি টিম’ বানান: “আমরা একটা টিম। টিমের কাজ সবাই ভাগ করে নিই।” দেওয়ালে চার্ট টাঙান। কে কী করবে টিক দিন।

২. গান চালান: কাজের সময় ফানি গান, ১০ মিনিটের টাইমার। “গান শেষ হওয়ার আগে ঘর গোছানো” – খেলা বানান।

৩. নিজে করুন: বাচ্চারা দেখে শেখে। আপনি ফোন ঘাঁটলে ওরা কাজ করবে না। “চলো, একসাথে করি” বলুন।

শেষ কথা:

আমরা সন্তানকে IIT, ডাক্তার বানাতে কোচিং দিই, লাখ টাকা খরচ করি। কিন্তু ‘জীবন এর আসল মানে ’ শেখাতে পারি – সেটা ভুলে যাই।

তাই আজ থেকে ‘পড়তে বস’ এর সাথে ‘চলো, টেবিলটা মুছে ফেলি’ বলুন।

কারণ মার্কশিট চাকরি দেয়, কিন্তু ঘরের কাজ জীবন চালানো শেখায়। আর জীবনটাই আসল পরীক্ষা।

PREV

Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News

Read more Articles on
click me!

Recommended Stories

মানুষের শরীর কত ডিগ্রি পর্যন্ত তাপ সহ্য করতে পারে? এর উপরে গেলেই...
সকালে উঠেই শরীর ম্যাজম্যাজ? থাইরয়েডের ক্লান্তি তাড়াতে বিছানায় শুয়েই করুন এই ৫ যোগাসন