
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে হেভিওয়েট লড়াইয়ে সরগরম গোটা এলাকা। ভবানীপুরে এবার ফের মুখোমুখি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী।
এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামে মমতাকে ১,৯৫৬ ভোটে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেই হারের পর, বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ইস্তফা দেওয়ায় ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে লড়ে জেতেন তৃণমূল সুপ্রিমো।এবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে ঘটে তার আশায় রয়েছে গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে এবার মমতার গড়ে শুভেন্দুকে হারিয়ে বদলা নিতে মরিয়া টিএমসি।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ভোটে ভবানীপুরে বিজেপির প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষকে ২৮,৭১৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তারও আগে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কেন্দ্র থেকেই কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেত্রী দীপা দাশমুন্সিকে ২৫,৩০১ ভোটে হারিয়েছিলেন। সেবার বিজেপি প্রার্থী চন্দ্র কুমার বসু মাত্র ১৯.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন।
এবারের ভোটে ভবানীপুর তথা গোটা রাজ্যে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় হল 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬১ লক্ষ ভোটের ফারাক এবং ২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গত ৮ এপ্রিল মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দেন, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের নাম ফেরানো না হলে দল আদালতে যাবে। তিনি বলেন, "অনেকের নাম বাদ যাওয়ায় আমি গভীরভাবে দুঃখিত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কিছু নাম ফেরানো হয়েছিল... যদি তাদের নাম পুনরুদ্ধার না করা হয়, তবে বহু মানুষ ভোট দিতে পারবেন না। প্রয়োজনে আমরা আবার আদালতে যাব।"
২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে এবং ভবানীপুরের সঙ্গে নিজের সংযোগের কথা তুলে ধরে মমতা বলেন, "আমি ছোটবেলা থেকে এখানে থাকি, আমার সবকিছু এখানেই। আমি ভবানীপুরের মানুষকে ধন্যবাদ ও সালাম জানাই। আমি মনোনয়ন জমা দিয়েছি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সব প্রার্থীর জয় কামনা করি। আমরাই সরকার গড়ব। সামনে আরও অনেক কর্মসূচি আছে। এই গরমে সবাই নিজের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।"
আবেগের তাস খেলার পাশাপাশি, বিজেপিকে বাঙালি সংস্কৃতির 'বাইরের লোক' হিসেবে তুলে ধরতে মমতা তাঁর "ডিম-মাছ" মন্তব্যকে হাতিয়ার করছেন। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনা নিয়েও তিনি একাধিকবার বিজেপিকে নিশানা করেছেন। গত নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ১,০৯,০২৪ জন পুরুষ এবং ৯১,৯১১ জন মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোটারকে মাথায় রেখে তৃণমূল 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্প এবং ইস্তেহারে মমতার '১০টি শপথ'-এর উপর জোর দিচ্ছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও দলের কর্মীদের এই প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে সাধারণ মহিলারা মাসে ১,৫০০ টাকা, SC/ST মহিলারা ১,৭০০ টাকা এবং বেকার যুবকরা মাসে ১,৫০০ টাকা পাবেন। অন্যদিকে, শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপি অনুপ্রবেশ-বিরোধী ইস্যুকে সামনে রেখে ভবানীপুরে নন্দীগ্রামের ফলের পুনরাবৃত্তি করতে চাইছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শুভেন্দুর সমর্থনে প্রচারও করেছেন।
বিজেপির ইস্তেহার প্রকাশের সময় শাহ বলেন, "আমরা শুধু বাংলার সীমান্ত অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সিল করব না, বাংলা দিয়ে ভারত থেকে একটিও গরু পাচার হতে দেব না, সেটাও নিশ্চিত করব।" উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের মতো ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) কার্যকর করাও বিজেপির অন্যতম অ্যাজেন্ডা। ভবানীপুরে অমিত শাহ নারী সুরক্ষা, বেকারত্ব এবং মমতা সরকারের দুর্নীতির মতো বিষয়গুলিকেও ভোটারদের কাছে তুলে ধরেছেন।
ভোটে তাঁকে প্রার্থী ঘোষণা করার অনেক আগে থেকেই ভবানীপুরে মনোযোগ দিয়েছিলেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ভোট ঘোষণার অনেক আগেই বলেছিলেন এবার ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতাকে হারাবেন। আর সেইলক্ষ্যে দীর্ঘ দিন ধরে ভবানীপুরে কাজও করেছেন। প্রার্থী ঘোষণার পরে ভবানীপুরে বেশি সময় দিচ্ছেন।
এদিকে, শুভেন্দু অধিকারী এবারের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম থেকেও বিজেপির টিকিটে লড়ছেন। কংগ্রেস এই কেন্দ্রে প্রদীপ প্রসাদকে প্রার্থী করেছে। অন্যদিকে, বামেরা যুব নেতা শ্রীজীব বিশ্বাসকে টিকিট দিয়েছে, যিনি এর আগে উপনির্বাচনেও মমতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।
ভবানীপুরে নিজেদের গড় রক্ষা করতে মরিয়ে তৃণমূল। অন্যদিকে বিজেপি এবার ভবানীপুর জিতে মমতাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে চায়। এই অবস্থায় মমতা-শুভেন্দু শেষ হাসি কে হাসবে তাই নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।