
পালা বদল হবে না যেমন চলছে তেমনই চলবে? কার হাতে থাকবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার চাবিকাঠি? এমনই এক গুচ্ছ প্রশ্নের উত্তর খুঁজাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। উত্তর জানা যাবে আগামী ৪ মে। ফল প্রকাশের দিন। পশ্চিমবঙ্গে এবার দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হবে ২৩ ও ২৯ মে। কিন্তু তা আগে দেখে ব্রিটিশ আমলে তৈরি বঙ্গ বিধানসভার পালা বদলের কাহিনি।
ইংরেজির 'H'অক্ষরের মত আকৃতি এই ভবনের। প্রাচীন এই ভবনটি বাংলার অনেক ইতিহাসের সাক্ষী থেকে। দেশভাগের যন্ত্রণা সহ্য করেছে। দাঙ্গার ভয়ঙ্কর রূপ দেখেছ। পাশাপাশি আধুনিক ভারতের ভাগ্যও নির্ধারণ করেছে।
ব্রিটিশ শাসনের পতনের শুরু থেকে বঙ্গ বিধানসভা দেখেছে বামপন্থার উত্থান। আবার দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানার পতনও প্রত্যক্ষ করেছে। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বঙ্গ বিধানসভা কাহিনি শুরু ১৯৩১ সালে। যখন কলকাতা ছিল না, ছিল ক্যালক্যাটা। চলত ব্রিটিশ রাজ।
১৯২৮ সালে যখন ভবনটির নকশা অনুমোদিত হয়, তখন স্থপতি গ্রিভস এটিকে ইংরেজি 'H' অক্ষরের আকৃতি দেন। 'H' আকৃতির পেছনের যুক্তি ছিল বায়ুপ্রবাহের সুবিধা, কিন্তু লোকেরা এটিকে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সাথে যুক্ত করত।
১৯৩১ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি যখন এটি উদ্বোধন করা হয়েছিল, তখন তামার গম্বুজ ও সুউচ্চ স্তম্ভবিশিষ্ট ভবনটিকে একটি রাজপ্রাসাদের মতো মনে হয়েছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচন প্রথমবারের মতো এর ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যার রাজনৈতিক প্রভাব আজও সুস্পষ্ট।
বাংলার সিংহ নামে পরিচিত এ কে ফজলুল হক বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছিল না। এই নির্বাচনে কংগ্রেস অসহযোগ নীতি গ্রহণ করেছিল। তাই মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টির জোট গঠন করে সরকারে এসেছিল।
বঙ্গ বিধানসভার সবথেকে অন্ধকার ইতিহাস হল ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা। ২০ জুন। বাইরে যখন দাঙ্গায় জ্বলছে কলকাতা তখন ভিরতে বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়ার কথা চলছে। সেই দিন শুধুমাত্র মানচিত্রে নয়। এই ভবনের ভিরতেও তৈরি হয়েছিল ফাটল। যা আজও থেকে গেছে বাঙালির মনের গোপনে।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২১শে নভেম্বর যখন স্বাধীন ভারতের প্রথম বিধানসভা এখানে অধিবেশন শুরু করেছিল, তখন এই একই করিডোরগুলো স্বাধীনতার তাজা বাতাসে শ্বাস নিয়েছিল। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে, বিধানসভার বাইরের রাস্তাগুলো "লাল সালাম" স্লোগানে মুখরিত থাকতো।
যখন বিধানচন্দ্র রায়ের মতো কিংবদন্তিতুল্য মুখ্যমন্ত্রীরা এখানে শাসন করতেন, তখন এই বিধানসভার মর্যাদা ছিল তুঙ্গে। ১৯৬৯ সালে, এই ভবনটি আরও একটি বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়। বিধানসভা সর্বসম্মতিক্রমে বিধান পরিষদ বিলুপ্ত করার একটি প্রস্তাব পাশ করে। এই পদক্ষেপের ফলে পশ্চিমবঙ্গ একটি এককক্ষীয় রাজ্যে পরিণত হয়।
তারপর এলো ১৯৭৭ সাল। জ্যোতি বসুর যুগ। টানা ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকার রেকর্ড। তাঁর আমলেই পাশ হয়েছিল ভূমি সংস্কারের মত বৈপ্লবিক আইন। বিধানসভায় বামেদের দাপট ছিল টানা ৩৪ বছর। তারপরে বামদুর্গের প্রতিটি ইঁট কাঁপিয়ে উত্থান হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
তখন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুর যাওয়ার পথে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। এর প্রতিবাদে তিনি সরাসরি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় চলে আসেন। সেখানেই তৃণমূলের বাকি সদস্যদের উপস্থিতিতে ভাঙচুর করা হয় বিধানসভার লবিতে। যদিও তিনি পরবর্তীকালে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২০০৭ সালে, যখন এই বিধানসভায় সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের প্রতিধ্বনি বেজে উঠেছিল, তখন মনে হয়েছিল যেন বাংলার রাজনীতির রক্তচাপ বেড়ে গেছে। ২০১১ সালে পরিবর্তনের স্লোগান নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ক্ষমতায় এলেন, বিধানসভার আবহ পুরোপুরি পাল্টে গেল। এখানকার সংগ্রামের ভাষা এখন অন্যরকম।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। বামেরা বিধানসভায় নিশ্চিহ্ন। কংগ্রেসও নেই। এবার লড়াই তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে। একদিকে 'খেলা হবে' অন্যদিকে 'জয়শ্রীরাম'স্লোগান। কে দখল করবে বঙ্গ বিধানসভা?