দলত্যাগ করেছেন কেরলের বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা পিসি চকো। এর ফলে বিধানসভা নির্বাচনের আগে জোর ধাক্কা খেয়েছে কংগ্রেস। ঠিক কী পরিস্থিতিতে ও কী কারণে তিনি দল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন? এশিয়ানেট নিউজএবল-কে একান্ত সাক্ষাতকারে তা জানিয়েছেন পিসি চকো। কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, শ্রমজীবী শ্রেনিকে অবহেলা, সর্বপরি দলীয় হাই কমান্ডের নিষ্ক্রিয়তা - সব নিয়েই মুখ খুললেন এই দলত্যাগী বিজেপি নেতা।

প্রশ্ন - আপনি চার দশক ধরে যে দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কংগ্রেস ছাড়ার কারণ কী?

পিসি চকো - এর পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। এটা কোনও আবেদের সিদ্ধান্ত নয়। গত ৩ মাস ধরে এই বিষয়ে আমি ভেবেছি। কংগ্রেসে প্রার্থী নির্বাচনের জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে প্রার্থীরা ত্রিস্তরীয় ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচিত হয়েছেন। শীর্ষে সনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রয়েছে। এই কমিটি সব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এর নীচে, কংগ্রেস সভাপতির নেতৃত্বে একটি প্রশিক্ষণ কমিটি রয়েছে। এই কমিটি প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করে এবং এটি কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রেরণ করে। এর নীচে রাজ্য নির্বাচন কমিটি রয়েছে, যা বিধানসভা কেন্দ্র অনুসারে প্রার্থীদের নাম তালিকা প্রস্তুত করে। রাজ্য নির্বাচন কমিটির সদস্যরা এক বা দুই দিনের সভা করেন। সেখানে কাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি তাই নিয়ে আলোচনা করে। তারপরই প্রার্থীদের নাম ঠিক করে। প্রার্থী নির্বাচনের জন্য এই সভা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যায়ে এটা সম্ভব নয়। আমি এই বিষয়ে জোর দিয়েছি। প্রথম সভাটি হুট করেই হয়েছিল এবং পরবর্তী সভাটি কখন অনুষ্ঠিত হবে তা সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় সভার পর বলা হয়েছিল প্রার্থীতালিকা এখনও প্রস্তুত করা যায়নি। তাই তৃতীয় বৈঠক করতে হতো। যে যে কেন্দ্রে জেতা সম্ভব সেগলি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। গতবার কংগ্রেসের ২২ জন বিধায়ক ছিল। ৫০ টি আসন পেলেই আমরা কেরলে সরকার গঠন করতে পারতাম। মুসলিম লিগ ১৮ থেকে ২০ টি আসন পেতে পারে এবং অন্যান্য দলগুলি ৫ থেকে ৬টি আসন পেতে পারে। তবে সেইসব বিবেচনা করার মতো কেউ ছিল না।

ওমান চান্ডি দিল্লি চলে গেলেন। রমেশ চেনিথালাও দিল্লির কেরল হাউসে গিয়েউঠলেন। সেখানে তাঁর সমর্থকরা রমেশ চেনিথালার কক্ষে বৈঠক করেন এবং তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন। ওমান চান্ডির সমর্থকরা আলাদা বৈঠক করেন। তাদের সিদ্ধান্তে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। এর পরে তালিকা প্রস্তুত করে স্ক্রিনিং কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়। স্ক্রিনিং কমিটির চেয়ারম্যান এইচকে পাতিল আমাকে প্রাতঃরাশের জন্য ডেকেছিলেন এবং আমার পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম যে আমি এখানে পরামর্শ দিতে আসিনি, প্রাতঃরাশে এসেছি। পাতিল আমাকে বলেছিলেন আপনি কেন আপনার মতামত দিচ্ছেন না। তাতে আমি বলেছিলাম যে আপনি ওমান চান্ডি এবং রমেশ চেনিথালাকে জিজ্ঞাসা করুন, তাদের সঙ্গে রাজ্য নির্বাচন কমিটির কোনও আলোচনা হয়েছে কিনা। তারা যদি বলে, সেখানে আলোচনা হয়েছে, তবে আমি আপনার সঙ্গে বসতে পারি। এই বিষয়টি সনিয়া গান্ধীর কাছেও পৌঁছেছিল। এর পরে সনিয়া গান্ধী কয়েকজন নেতাকে জিজ্ঞাসা করেন, প্যানেলটি কীভাবে তৈরি করা হয়েছে? প্যানেলের নামগুলি নিয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হয়েছিল কিনা? তাদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কিনা? রাহুল গান্ধীও এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে কমিটির কেরলের নেতাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সবাই এর জন্য তৈরি ছিল, কিন্তু কিছুই হয়নি।

আমার মতো মানুষ, যাদের পার্টিতে ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা শুধুই দেখছেন। অন্যরা অযোগ্য প্রার্থীদের নাম আনছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কী করতে পারে? আমি প্রার্থী ছিলাম না, আমি প্রার্থী হতেও চাইনি। কাউকে কিছু পরামর্শও দেওয়ার ছিল না আমার। আমার কোনও সমর্থকও নেই। সত্যি কথাটা হ'ল কংগ্রেস জমি হারাচ্ছে এবং এতে বামফ্রন্টের উপকার হওয়া উচিত। তাই, পদত্যাগ করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। আমি এই সিদ্ধান্তটি আবেগপ্রবন হয়ে নিইনি।

প্রশ্ন- আপনার মতো ২৩ জন বিশিষ্ট নেতাও বলছেন যে কংগ্রেসে কোনও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই। তাঁরা প্রতিবাদ করছেন। কি বলবেন?

পিসি চকো - এটি একেবারে সঠিক পদক্ষেপ। তবে, আমি ২৩জন কংগ্রেস নেতা নিয়ে গঠিত গোষ্ঠীটির সদস্য নই। যখন নেতাদের স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছিল, তখন আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। ওঁরা সবাই আমার বন্ধু। আমি ওঁদের বলেছিলাম যে আমি স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে যোগ দেব না। এই জাতীয় স্বাক্ষর সংগ্রহ সাধারণত দলবিরোধী কার্যকলাপ হিসাবে বিবেচিত হয়। তবে, তাঁরা যে বিষয়টি তুলছে, তা কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে আইনী চ্যালেঞ্জ। তারা বলেছে, তারা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি নির্বাচন করতে চায়। তাদের আরও দাবি, প্রতি বছর অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (AICC)-র একটি সম্মেলন করা উচিত। দলের গঠনতন্ত্রে এ জাতীয় ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এতে কোনও ভুল নেই। তারা সনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেননি বা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও কিছু বলেননি। দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তারা কোনও কথা বলেননি। তারা কেবল কংগ্রেস সংবিধানে যা রয়েছে, তাই দাবি করেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই ২৩ জন নেতা কংগ্রেস ছাড়বেন। কিন্তু, সনিয়া গান্ধী তাদের আলোচনার জন্য ডেকেছেন। কপিল সিবাল, গোলাম নবি আজাদ ও অন্যান্য নেতারা কেউ দলের বিপক্ষে নন। তারা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি নির্বাচন চাইছেন। এই মুহুর্তে, কংগ্রেসে নিচের স্তরের লোক এবং ব্যক্তিগত কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পার্টির প্রতিটি স্তরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের আধিপত্য রয়েছে। কংগ্রেস সভাপতির পদটি দেড় বছর ধরে খালি। জাতীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ক্ষেত্রে দলের মধ্যে কোনও সমন্বয় নেই। কৃষকরা আন্দোলন করছেন, এই নিয়ে দলের কোনও নির্দিষ্ট নীতি নেই। অন্যান্য বিরোধী দলগুলিও মনে করছে কংগ্রেসের আরও বেশি সক্রিয় হওয়া উচিত।

প্রশ্ন - আপনাকে কি দলে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল? ওমান চান্ডি এবং চেনিথালাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?

পিসি চকো - শুধু আমি নয়, সুধীরণ, কে সুধাকরণ-এর মতো নেতারাও তেমন গুরুত্ব পাননি। আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাকে একা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়নি। আমি একাই পদত্যাগ করেছি ঠিকই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে কেউ আমার সঙ্গে একমত নন। সুধীরন ও পিজে কুরিয়ান বিবৃতি জারি করেছেন। রামচন্দ্রন বলেছেন, এই বিষয়গুলি বিবেচনা করা উচিত। এর অর্থ কি? এর অর্থ হ'ল কেউ আমার বিরোধিতা করেনি। অনেক বিশিষ্ট নেতাকেই অবহেলা করা হয়েছে। ওমান চান্ডি, রমেশ চেনিথালা এবং তাদের সমর্থকরা ছাড়া সবাইকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

প্রশ্ন - আপনি কি মনে করেন আসন্ন নির্বাচনে ইউডিএফের পারফরম্যান্স খারাপ হবে?

পিসি চকো - ভাল হবে না। আমরা যদি সঠিক প্রার্থীদের বাছাই করতাম এবং আরও ভাল করে প্রচার করতাম তবে ফল ভাল হতে পারত। এখন মনে হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে, জমি হারাচ্ছে কংগ্রেস। অবিরাম কংগ্রেসের পতন হয়ে চলেছে। ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকেকিছুই বলা যায় না, তবে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা কম।

প্রশ্ন - কেন আপনি মনে করছেন কেরলে কংগ্রেস গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের শিকার?

পিসি চকো - এর কারণ হ'ল প্রথম থেকেই কেরলে কংগ্রেসের দুটি গোষ্ঠী রয়েছে। একটি ছিল অ্যান্টনি এবং অন্যটি করুণাকরণ। এখন ওমান চান্ডি এবং রমেশ চেনিথালা তাঁদের জায়গা নিয়েছেন। অ্যান্টনি এবং করুণাকরণের হৃদয়ে দলের প্রতি ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা ছিল। সুতরাং, বিতর্ক এবং আদর্শিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্য়ে সর্বদা একটা ঐক্য ছিল। তবে এখন আর আগের মতো নেই। পরিস্থিতি বদলেছে। এখন প্রতিটি স্তরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পরিবেশ রয়েছে। পৌর নির্বাচনেও এটা দেখা গিয়েছে। গত ৪০ বছর ধরে জিতে আসলেও এবার আমরা এর্নাকুলাম পৌরসভায় হেরেছি। আমি এর্নাকুলামে ছিলাম, তবে আমার ওয়ার্ডে ছিলাম। প্রার্থী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার সঙ্গে কোনও পরামর্শ করা হয়নি।

প্রশ্ন - পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কি আপনি কংগ্রেস হাই কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?

পিসি চকো - আমি রাহুল গান্ধীকে বলেছিলাম, কী চলছে। তিনি যখন নাগেরকোয়েল থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে বিমান ধরার জন্য এসেছিলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। বিমানবন্দরে রাহুল গান্ধী যখন প্রায় আধঘন্টা মতো বসেছিলেন, তখন আমি তাঁকে সমস্ত কথা বলেছিলাম। আমি তাঁদের কেরালে এই প্রশ্নগুলি নিয়ে আলোচনা করতে বলেছিলাম। তাঁরাও এর জন্য তৈরি ছিলেন, কিন্তু পরে আর সময় পেলেন না। এখন মনে হয়, কেউই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।

প্রশ্ন - গত নির্বাচনে কংগ্রেস জোর ধাক্কা খেয়েছে। আপনি কি মনে করেন কংগ্রেস আবার জিতে ফিরে আসতে পারে?

পিসি চকো - এটা ভাবা আমার কাজ নয়। যারা ক্ষমতায় আছেন এবং পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, এটা  তাদের সমস্যা। কংগ্রেসে সভাপতির গুরুত্ব সর্বাধিক। যিনি দলের সভাপতি, তাঁকেই ভাবতে হবে, তিনি দলকে কোথায় নিয়ে যেতে চান। তাঁকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে। যতদূর আমি জানি, আমি এখন বহিরাগত।

প্রশ্ন - অন্যান্য নেতাদের মতো আপনিও কেরলে বিজেপিতে যোগ দেবেন?

পিসি চকো - না, কখনই না। আদর্শভাবে, আমি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম এবং বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সঙ্গে কখনও কোনও সংযোগ রাখতে পারব না।

প্রশ্ন - এমন জানা গিয়েছে, আপনি কেরলে এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন। কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি আপনাকে দলে ফিরে আসতে অনুরোধ করে, তবে আপনি কি আপনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন?

পিসি চকো - আমার সামনে অনেকগুলি বিকল্প রয়েছে, যার ভিত্তিতে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। আমি কোনও তাড়াহুড়ো করায় নেই। আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও কথা হোক, এটা চাই না। সমস্ত বিশিষ্ট নেতারা যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তারা ফোন করল, আমি ফোন ধরিনি। আমি কংগ্রেস নেতৃত্বকে চাপ দিতে পদত্যাগ করিনি।