সমাজে প্রচলিত আছে শুধু ছেলেরাই তর্পণ করতে পারে। কিন্তু শাস্ত্র কী বলছে? মেয়েরা, পুত্রবধূরা বা বোনেরা কি তর্পণ করতে পারেন না? ধর্মীয় গবেষকরা কী বলছেন জেনে নিন।

বহুকাল ধরে আমাদের সমাজে একটা কথাই প্রচলিত হয়ে আসছে যে, শুধু পুত্রসন্তানই বাবা-মায়ের বা পূর্বপুরুষদের তর্পণ বা পিণ্ডদান করতে পারে। মেয়েদের এই অধিকার নেই। কিন্তু আপনি যদি প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ এবং পুরাণ ঘেঁটে দেখেন, তাহলে এই ধারণার সম্পূর্ণ অন্য এক উদার এবং মানবিক রূপ পাওয়া যায়।

আসলে হিন্দু ধর্মের কোনও মূল শাস্ত্র যেমন গরুড় পুরাণ বা মার্কণ্ডেয় পুরাণে এমন কোনও কঠোর নিষেধাজ্ঞা লেখা নেই যে মহিলারা তর্পণ করতে পারবেন না। ধর্মীয় গবেষকদের একাংশের মতে, তর্পণের মূল উদ্দেশ্যই হল প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানানো। আর শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার তো পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে সকলেরই আছে। এখানে লিঙ্গভেদের কোনও স্থান নেই।

শাস্ত্র অনুযায়ী কারা কারা তর্পণের অধিকারী?

শাস্ত্রে স্পষ্ট বলা আছে, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে রক্তের বা আত্মিক সম্পর্কের যে কোনও ব্যক্তিমাত্রই তর্পণের অধিকারী। শুধু পুত্রই নয়, পরিবারের অন্যরাও এই পবিত্র কাজ করতে পারেন।

প্রথমত, কন্যাসন্তান: যে পরিবারে কোনও পুত্রসন্তান নেই, সেখানে কন্যাসন্তানেরাই অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বাবা-মায়ের তর্পণ করতে পারেন। এমনকি পুত্র থাকলেও, যদি কন্যা শ্রদ্ধাভরে পিতৃপুরুষদের জলদান করতে চান, তাতেও কোনও বাধা নেই। পিতার প্রতি কন্যার ভালোবাসাও তো সমান।

দ্বিতীয়ত, পুত্রবধূ: যদি কোনও কারণে পুত্র বা কন্যা কেউ তর্পণ করতে অপারগ হন, সেক্ষেত্রে পুত্রবধূরাও শ্বশুর-শাশুড়ির উদ্দেশে তর্পণ বা জলদান করতে পারেন। শাস্ত্রে পুত্রবধূকেও কন্যাসমই মনে করা হয়।

তৃতীয়ত, বোন বা অন্য নিকটাত্মীয়: যদি কোনও অবিবাহিত ব্যক্তির অকালপ্রয়াণ ঘটে, তাহলে তাঁর বোন বা পরিবারের অন্য নিকটাত্মীয়রাও তাঁর আত্মার শান্তির জন্য তর্পণ করতে পারেন। এর মূল কারণ হল, আত্মার সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক।

আসল সত্যিটা কী?

আসলে তর্পণ কোনও লোক দেখানো আচার বা শুধুমাত্র একটি নিয়ম পালন নয়। এটি হল পূর্বপুরুষদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম, তাঁদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে, বিবাহিত-অবিবাহিত বা কোনও সামাজিক সংস্কারের বাধা থাকা উচিত নয়। মন থেকে ভক্তিভরে করা যে কোনও তর্পণই পূর্বপুরুষদের কাছে পৌঁছায়, এমনটাই বলছে শাস্ত্রের উদার ব্যাখ্যা।