মন্দিরে ঢুকেই ঘণ্টা বাজানো কি শুধুই অভ্যাস? একদম না। এর পিছনে আছে গভীর শাস্ত্রীয়, আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ। আগম শাস্ত্র থেকে মস্তিষ্কের বিজ্ঞান - ঘণ্টার টুং-টাং ধ্বনিতে লুকিয়ে আছে ওঁ-কার, নেগেটিভ এনার্জি দূরীকরণ ও জীবাণু নাশের রহস্য।
আপনি কি খেয়াল করেছেন, মন্দিরে ঢোকার মুখে সবার হাতটা আপনা-আপনি ঘণ্টার দিকে চলে যায়? টুং করে একটা আওয়াজ না করলে মনে হয় যেন দেব দর্শনই অসম্পূর্ণ থেকে গেল। ছোট থেকে আমরা দেখে আসছি, তাই করি। কিন্তু শাস্ত্র বলছে, এই ছোট্ট কাজটার ফল বিশাল।
১. শাস্ত্রীয় কারণ - দেবতাকে জাগানো ও অশুভকে তাড়ানো: হিন্দু আগম শাস্ত্র অনুযায়ী, মন্দির হল দেবতার ঘর। ঘণ্টা বাজানো মানে নিজের আগমনের ঘোষণা করা, যেমন আমরা কারও বাড়ি গিয়ে কলিং বেল বাজাই। বলা হয়, ঘণ্টার ধ্বনিতে স্বয়ং "ওঁ" উচ্চারিত হয়। ওঁ-ই হল সৃষ্টির আদি শব্দ, ব্রহ্মনাদ। এই ধ্বনি শুনে দেবতার নিদ্রা ভঙ্গ হয়, তিনি জাগ্রত হন এবং ভক্তের প্রার্থনা শোনেন।
স্কন্দ পুরাণে স্পষ্ট বলা আছে - "ঘণ্টানাদং কৃত্বা যঃ পূজাং করোতি, শতাশ্বমেধ ফলং লভেৎ" অর্থাৎ ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো করলে ১০০ অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান পুণ্য লাভ হয়। আরও বিশ্বাস করা হয়, ঘণ্টাধ্বনি এতটাই পবিত্র যে এর শব্দে ভূত-প্রেত, অশুভ শক্তি ও নেগেটিভ এনার্জি মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে দূরে সরে যায়। তাই ঘণ্টা সবসময় মন্দিরে প্রবেশের সময় বাজাতে হয়, বেরোনোর সময় নয়।
২. বৈজ্ঞানিক কারণ - যা শুনলে চমকে যাবেন:
ক) মস্তিষ্ককে রিসেট করা: বিজ্ঞানীরা মেপে দেখেছেন, মন্দিরের ঘণ্টার শব্দের তীক্ষ্ণতাও প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ Hz এবং এর অনুরণন বা Echo থাকে অন্তত ৭ সেকেন্ড। এই দীর্ঘ, গম্ভীর আওয়াজ কানে যেতেই আমাদের মস্তিষ্কের বাঁ ও ডান দিক একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে যায়। বাইরের জগতের হাজারো চিন্তা, অফিসের টেনশন, রাস্তার কোলাহল এক সেকেন্ডে বন্ধ হয়ে যায়। মন একাগ্র, শান্ত ও পুজোর জন্য প্রস্তুত হয়। অনেকটা মেডিটেশনে বেল বাজানোর মতো।
খ) পঞ্চধাতু ও জীবাণু নাশ: সাধারণ ঘণ্টা নয়, মন্দিরের ঘণ্টা তৈরি হয় বিশেষ পঞ্চধাতু দিয়ে - তামা, দস্তা, লোহা, নিকেল ও ক্রোমিয়াম - এক বিশেষ অনুপাতে। এই ধাতুগুলো এমনভাবে মেশানো হয় যাতে ঘণ্টা বাজালে যে কম্পন তৈরি হয়, তা বাতাসে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে নষ্ট করতে সাহায্য করে। অনেকটা প্রাচীনকালে তামার পাত্রে জল রাখার মতোই বিজ্ঞান।
গ) শরীরের ৭ চক্র: যোগশাস্ত্র মতে, ঘণ্টার গভীর নাদ আমাদের শরীরের মূলাধার থেকে সহস্রার - সাতটি চক্রকে স্পর্শ করে এবং এনার্জি ব্যালেন্স করে।
তাহলে সঠিক নিয়ম কী? অনেকে ঘণ্টা আলতো করে ছুঁয়ে চলে যান। শাস্ত্র বলছে, ঘণ্টা এমনভাবে বাজান যাতে তার গম্ভীর আওয়াজ অন্তত ৭ সেকেন্ড ধরে গমগম করে। বাজানোর সময় চোখ বন্ধ করে ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করুন। আর দুই হাতে ঘণ্টা বাজাবেন না, এক হাতে বাজিয়ে অন্য হাতে প্রণাম করুন।
তাই পরেরবার মন্দিরে গিয়ে শুধু অভ্যাসে নয়, এই বিজ্ঞান ও ভক্তি মনে রেখে ঘণ্টা বাজান। দেখবেন, পুজোর অনুভূতিটাই বদলে গেছে।


