১৯৫৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের 'অপুর সংসার'। বাংলা ফিল্ম জগত পেয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-কে। সেই সময় উত্তম কুমার একেবারে খ্য়াতির মধ্যগগনে। ছয় ও সাতের দশক জুড়ে ছিল তাঁর খ্য়াতি। কিন্তু তার পাশেই নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন সৌমিত্র। হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক বাঙালির মনের মানুষ, বিশ্ব দরবারে বাঙালি সমাজের প্রতিনিধি।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছিলেন উত্তম কুমারের তারকা ছটার পাশে নিজের জায়গা তৈরি করাটা তাঁর পক্ষে মোটেই সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু, উত্তম কুমার যদি 'নায়ক' হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি ছিলেন একেবারে পাশের বাড়ির যুবক, তবে সেই যুবক চিন্তাশীল। আর এখানেই আন্তর্জাতিক বাঙালি মন জিতে নিয়েছিলেন সৌমিত্র এবং তাঁর অভিনিত চরিত্ররা। সৌমিত্রকে ঘিরে বাঙালি পরিচয় মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল এক বিশ্বজনীন পরিচয়ের সঙ্গে। মনে প্রাণে বাঙালি হয়েও মূল্যবোধে পশ্চিমী উদারনৈতিক। জাতীয়তাবাদের গণ্ডি ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক।

নিঃসন্দেহে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এই বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার পিছনে অনেকটাই অবদান সত্যজিৎ রায়-এর। যে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছেছিল ভারতীয় চলচ্চিত্র। স্বাভাবিকভাবেই, তাঁর প্রধান অভিনেতার উপরও সমান মনোযোগ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ফিল্ম জগৎ। তবে তাঁর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পিছনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের শৈলীরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তপন সিনহা বা মৃণাল সেনের ছবিতেও তাঁর অভিনয়, আন্তর্জাতিক আঙিনায় সমান স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই অভিনয় শৈলী কিন্তু তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক সিনেমা দেখেই, নিজেই জানিয়েছিলেন সৌমিত্র।

২০০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। সমান তালে কুড়িয়েছেন বাণিজ্যিক সাফল্য এবং সমালোচকদের প্রশংসা। সঙ্গে অসংখ্য মঞ্চাভিনয়, কবিতা, আবৃত্তি - যে কোনও পরিপূর্ণ শিল্পীর মতোই নিজেকে ক্রমাগত ভেঙেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বাঙালি তথা আন্তর্জাতিক ফিল্ম জগৎ তাঁকে প্রথম চিনেছিল অপু হিসাবে। কয়েক বছর পরই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফেলুদা। একের পর এক ভাঙা-গড়া চরিত্রে বাঙালিকে নিয়ে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক আঙিনায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন তাঁর অভিনিত চরিত্রগুলির মতোই। যারা একেবারে সাধাসিধে বাঙালি চরিত্র হলেও সংবেদনশীলতায় বিশ্বজনীন।