তপন মল্লিক: ছোটবেলায় হিন্দি ছবিতে দেখতেন নায়ক বাক্স ভর্তি টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে তিনিও বাক্স ভর্তি টাকা রোজগার করে বাড়ি ফিরবেন আর সেই টাকা ভর্তি বাক্স তিনি উপহার দেবেন তাঁর মাকে। তবে সিনেমার হিরো হবেন বা অভিনয় করবেন সেরকম কোনও স্বপ্নও তিনি দেখতেন না। বরং ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেট খেলতেন বলে। অল রাউন্ডার হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু বেশি পছন্দ করতেন বল করতে। তাঁর নিজের কথা অনুযায়ী, ‘আমার অধিনায়ক আমার বোলিং খুব পছন্দ করত। তাই আমাকে বোলার বানিয়ে দিয়েছিল। আমি শুধু বল ছুঁড়ে দিতাম আর তাতেই ২-৩ উইকেট জুটে যেত’।এই অলরাউন্ডারটি অনূর্ধ্ব-২৩ সি কে নাইডু প্রতিযোগিতায় খেলার জন্য নির্বাচিতও হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সঙ্কট তাঁর ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল। মাত্র আড়াইশো টাকার জন্য জয়পুর থেকে অজমেরে খেলতে যেতে পারেননি তিনি। এর পরেই হতাশায় ক্রিকেট ছেড়ে দেন। 

আসল নাম সাহাবজাদে ইরফান আলি খান। কিন্তু নিজের লম্বা নামটি শুনতে নিজেরই ভাল লাগত না। তাই নামটি নিজেই ছোট করে ইরফান করে নেন। ২০১২-তে তাঁর নামের বানানের মধ্যে তিনি একটি অতিরিক্ত ‘আর’ যোগ করে নেন কারণ তাঁর এই শব্দটি শুনতে নাকি ভাল লাগত।ক্রিকেট থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে ইরফান ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় পড়ার সুযোগ পান। এম এ পড়তে পড়তেই এনএসডি-তে একটি স্কলারশিপ পান। জানা যায়, তিনি নাকি ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামাতে ভর্তির সময় থিয়েটারে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে মিথ্যে কথা বলেছিলেন। তবে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামাতেই তিনি দেখা পান তাঁর ভবিষ্যতের স্ত্রী সুতপা শিকদারের।

তবে ন্যাশনাল ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে পাশ করে বেরিয়ে মুম্বইতে তিনি প্রথম চাকরি পান একজন এসি মেকানিকের। তাঁর এই চাকরি নিয়েও একটি গল্প চালু আছে। তিনি নাকি এসি মেকানিকের চাকরির প্রথম দিকে বলিউডের সুপারস্টার রাজেশ খান্নার বাড়িতে গিয়েছিলেন এসি সারাতে। এই চাকরি করার বেশ কিছুদিন পর ইরফান অভিনয়ের সুযোগ পান টেলিভিশনে। 'চানক্য', 'ভারত এক খোঁজ', 'সারা জাহাঁ হামারা, 'বানেগি আপনি বাত', 'চন্দ্রকান্তা' এবং 'স্টার বেস্ট সেলার্সে'র মতো ধারাবাহিকগুলিতে তিনি অভিনয় করেন। 

ইরফানের স্ত্রী সুতপা শিকদারের কথা থেকেই জানা যায় ইরফান খান টেলিভিশনের একটি ধারাবাহিক ‘বানেগি আপনি বাত'-এর কয়েকটি পর্ব পরিচালনা করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকটির চিত্রনাট্যকার সুতপা শিকদার। সুতপা জানান, ইরফানকে সন্তুষ্ট করতে তাঁকে ‘বানেগি আপনি বাত'-এর চিত্রনাট্য ১১ বার লিখতে হয়েছিল। অভিনেতা ইরফান খানের উচ্চতা ছিল ছ’ফুট এক ইঞ্চি। মুম্বাই সিনেমা দুনিয়ায় তিনি লম্বায় অনায়াসে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু তাঁর ওই উচ্চতাই আবার তাঁর জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে’ ছবিতে তাঁকে একটি গুরুতবপূর্ণ চরিত্রে নির্বাচন করা হয়েছিল, কিন্তু ইরফানের সেই উচ্চতার জন্যই শেষ পর্যন্ত চরিত্রটিকে কাটাছাঁট করে ছোট করে দেওয়া হয়। তবে ইরফান খানই বলিউডের একমাত্র অভিনেতা যিনি দু'টো অস্কার পুরস্কার জেতা ছবিতে অভিনয় করেছেন- ভারতীয় লেখক বিকাশ স্বরূপের উপন্যাস ‘Q & A’ অবলম্বনে ড্যানি বয়েল-এর 'স্লামডগ মিলিওনেয়ার' এবং ইয়ান মার্টেলের উপন্যাস অবলম্বনে অ্যাং লি পরিচালিত 'লাইফ অফ পাই'।

বলিউডে অভিনয় জীবন শুরু করেও যে খুব একটা সুবিধজনক অবস্থায় ছিলেন তাও নয়। একের পর এক ফ্লপ ছবির মুখ দেখতে হয়েছিল তাঁকে। সেই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। ওই বছর গ্যাভিন ও'কনার পরিচালিত ‘দ্য ওয়ারিয়ার’ ছবি ইরফানের অভিনয় জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ওই ছবিতে তিনি ছেলেন মুখ্য চরিত্র। ওই ছবির সাফল্যের পর থেকে তিনি হয়ে উঠলেন সিনেমা দুনিয়ার একজন পরিচিত মুখ। সাধারণত কোনও অভিনেতাই হলিউডের কোনও ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন না। হলিউড সব সময়েই একজন অভিনেতার কাছে চূড়ান্ত লক্ষ্য। কিন্তু ইরফান খান ক্রিস্টোফার নোলানের মতো পরিচালকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ক্রিস্টোফার নোলান তাঁর 'ইন্টারস্টেলার' ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইরফান খানকে। কিন্তু তা গ্রহন করতে পারেন নি ইরফান। সেই সময়ে তাঁর 'লাঞ্চ বক্স' এবং 'ডি ডে' ছবিতে অভিনয়ের কথা ছিল। কেবলমাত্র তাই নয় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন স্কারলেট জনসন,  দি’ক্যাপ্রিওর সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ। ইরফানের অভিনয়ে আপ্লুত হয়েছিলেন জুলিয়া রবার্টসের মতো অভিনেত্রীও। একটি অস্কার সম্মানের রাতে জুলিয়ারবার্টস তাঁকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে মীরা নায়ারের 'নেমসেক’ ছবিতে তাঁর অভিনয় নিয়ে প্রশংসা করেছিলেন।  তবে নিজের পুরো নাম থেকে সাহাবজাদে অংশটি বাদ দিয়ে তিনি আসুবিধারই মুখোমুখি হয়েছিলেন। লস এঞ্জেলেস এয়ারপোর্টে তাঁকে দু'বার আটকানো হয়েছিল কারণ তাঁর নামের সঙ্গে একজন আতঙ্কবাদীর নামের মিল ছিল।