শিশুশিল্পী হিসাবে জীবন শুরু করে এখনও তিনি ভারতীয় সিনেমা দুনিয়ার সুপারস্টার। মাত্র ৪ বছর বয়সে তামিল ছবি ‘কালাথুর কান্নামা’-য় অভিনয় করে পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। এর ১৪ বছর পর ‘উনরচিগাল’ ছবির চিত্রনাট্য লেখেন, যদিও সে বছর ছবিটি নিষিদ্ধ হয়, মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। মূলত তামিল ছবির জনপ্রিয় নায়ক হলেও তেলুগু, হিন্দি, মালয়লম, তামিল, কন্নড় এবং বাংলা ৬ টি ভারতীয় ভাষায় অভিনয় করেছেন।

হিন্দি ও তামিল সিনেমা দুনিয়ায় তিনি অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং প্রযোজক হিসেবে পরিচিত হলেও বহু ছবিতে তিনি কোরিওগ্রাফার এবং মেক আপ আর্টিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। উল্লেখ করা যায় হিন্দি ছবি ‘সনম তেরি কসম’ ‘উরুভঙ্গল মারালাম’-সহ আরও বহু তামিল ছবিতে তিনি কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন, মেক-আপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন তামিল ছবি ‘থুঙ্গা ভনম’ ছবিতে। কেবল তাই নয়, বহু ছবিতে তিনি সহ পরিচালক-কোরিওগ্রাফার-মেক আপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন।  

জনপ্রিয় তামিল ছবির নায়ক কমল হাসানকে আধ ঘন্টার নোটিশে স্টুডিওতে পৌঁছে গানও রেকর্ডিং করেতে হয়েছে। পঙ্কজ কাপুর অভিনীত 'হাপ্পি' ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ইলায়ারাজা। গান রেকর্ডিং করতে গিয়ে নির্ধারিত শিল্পির গাওয়া গান তাঁর কিছুতেই পছন্দ হচ্ছিল না। তখন তিনি তার সহকারিকে বলেন কমল হাসানকে ফোন করতে। ইলায়ারাজা কমল হাসানের অতি শ্রদ্ধার পাত্র। ফোনে দু-এক মিনিট কথা হয় দুজনের মধ্যে। তার আধঘন্টার মধ্যেই স্টুডিওতে হাজির হন কমল হাসান। ছবির পরিচালক ভাবনা তলওয়ার জানান, চার্লি চ্যাপলিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তৈরি হয় ওই ছবিটি। সেখানে 'জিন্দেগি ডিস' বলে গানটি রেকর্ডিংয়ের জন্য্ চেন্নাইতে হাজির হন সুরকার, ছবির পরিচালক সহ নির্দিষ্ট শিল্পীও। কিন্তু ওই শিল্পীর গাওয়া গান কিছুতেই পছন্দ হচ্ছিল না ইলায়ারাজার। তখনই ডাক পড়ে কমল হাসানের এবং গানটি তিনি গেয়ে দেন অনায়াস দক্ষতায়। 

কমল হাসানই প্রথম ভারতীয় অভিনেতা যিনি নিজের ফ্যান ক্লাবকে জনকল্যাণের কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর ফ্যান ক্লাব হয়ে উঠেছে ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। কমল হাসানের 'নারপানি লায়াক্কম' গত ৩৮ বছর ধরে মানুষের জন্য কাজ করছে। ৩০ কোটি টাকার জনকল্যাণমূলক প্রকল্প রয়েছে তাঁদের। কমল হাসান একমাত্র অভিনেতা যাঁর ছ'টি ভাষায় অভিনীত ছবি সিলভার জুবিলি রেকর্ড করেছে। দেশের আয়কর বিভাগ কমল হাসানকেই একমাত্র অভিনেতা হিসেবে সম্মানিত করেছে কারণ তাঁর আয়করে কোনওদিন কোনও বকেয়া থাকে না। 


এ পর্যন্ত কমল হাসান অভিনীত সাতটি ছবি অস্কারের মনোনয়নের জন্য পাঠানো হয়েছে। আর কোনও ভারতীয় অভিনেতার এতগুলি ছবি এই তালিকায় জায়গা পায়নি।তবে রূপালি পর্দার চেয়েও রঙিন কমল হাসানের ব্যক্তি জীবন। এক সময়ের দক্ষিণী নায়িকা শ্রীবিদ্যা, নৃত্যশিল্পী বাণী গণপতি, বলিউড অভিনেত্রী সারিকা থেকে সিমরন বাগ্গা অথবা গৌতমীর সঙ্গে কমল হাসান ঘনিষ্ঠ হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। তবে বাণী এবং সারিকার সঙ্গে তিনি বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যদিও কমল হাসান বলেছিলেন, তিনি বিয়েতে বিশ্বাস করেন না। প্রেমিকার সামাজিক পরিচিতির কথা ভেবেই তিনি দুটি বিয়ে করেছিলেন।

দক্ষিণী সিনেমায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সময় কমল হাসানের সঙ্গে নায়িকা শ্রীবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুজনে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে শ্রীবিদ্যা সম্পর্ক ভেঙে চলে গিয়েছিলেন। তবে শ্রীবিদ্যা যখন হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়, তখন কমল হাসান তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ক্যানসার আক্রান্ত শ্রীবিদ্যার মৃত্যুর পর কমল হাসান ও শ্রীবিদ্যার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবি মুক্তি পায় মালয়ালম ছবি ‘থিরাক্কথা’। শ্রীবিদ্যার পর নৃত্যশিল্পী বাণী গণপতি। তারা বিয়ে করেন। কমল চেয়েছিলেন লিভ ইন সম্পর্কে থাকতে। কিন্তু বাণী সেই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। বিয়ের পর ১০ বছর সংসার তারপর বিচ্ছেদ। অনেকেই বলেন, কমল ও বাণীর দাম্পত্যের মধ্যে সারিকা চলে এসেছিলেন। 

এক সময় কমল হাসানের সঙ্গে সারিকার সম্পর্ক ছিল দক্ষিণী সিনেমা দুনিয়ায় সব থেকে চর্চিত বিষয়। যখন তাদের বিয়ে হয় তখন তাদের বড় মেয়ে শ্রুতির বয়স দু’বছর। কিন্তু কমল-সারিকার ১৬ বছরের দাম্পত্যও ভেঙে যায়। শোনা যায়, কমল হাসান একইসঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন নায়িকা সিমরন বাগ্গা এবং সারিকার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী গৌতমীর সঙ্গে। ইতিমধ্যে ছবির শুটিংয়ে ২২ বছরের ছোট সিমরনের সঙ্গে কমল হাসানের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। তবে তাদের সম্পর্ক বেশি দিন টেকেনি। এরপর কমল হাসান দীর্ঘদিন গৌতমীর সঙ্গে লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন। কিন্তু ১৩ বছর পরে ভেঙে যায় তাদের সম্পর্ক। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরেও গৌতমীর পাশে ছিলেন কমল হাসান। গৌতমী ক্যানসার-আক্রান্ত। ক্যানসারের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের শরিক ছিলেন কমল হাসান।