পারলেন না রানি। যেভাবে এই তিরানব্বই বছর বয়সেও আগলে রেখেছেন রাজপরিবারের মান-মর্যাদা, তাতে যেন এবার রীতিমতো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। তাই একপ্রকার আদরের ধন ছোট রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-কে বহিষ্কার করতে বাধ্য হলেন ব্রিটিনের রাজরানি এলিজাবেথ। বার্মিংহাম প্যালেস সূত্রে খবর রানি ছোট রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-র উপরে এতটাই খাপ্পা যে বুধবার রাতে তাঁকে ডেকে পাঠান। তুমুল ভর্ৎসনা করেন এবং জানিয়ে দেন তাঁকে রাজপরিবারের সমস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে ছুটি করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাজপরিবার থেকে পাওয়া ২৪৯,০০০ পাউন্ডের অর্থ অনুদান আর পাবেন না অ্যান্ড্রিউ। শুধুমাত্র তাঁকে দেওয়া হবে রানি এলিজাবেথের ব্যক্তিগত আয় থেকে পাওয়া অর্থ। 

ছোট রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ ব্রিটিশ রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী বড় রাজকুমার চার্লসের আড়ালেই থেকে গিয়েছেন। কিন্তু, তাঁর ব্যবহার এবং শিক্ষিত মহলের সঙ্গে ওঠা-বসায় বরাবরাই তিনি রানি এলিজাবেথের চোখের মণি। বলতে গেলে ছোট রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-কে চোখে হারান ব্রিটিশ রাজপরিবারের রানি। যার জেরে গত কয়েক মাস ধরে রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-কে নিয়ে একের পর এক বিতর্কমূলক খবর হলেও রানি ছিলেন অবিচল। অন্ধ্র ধৃতরাষ্ট্রের মতোই সন্তানস্নেহে মজে ছিলেন। কিন্তু, ছোট রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-কে নিয়ে বিতর্কে চূড়ান্ত পেরেকটা পুঁতে দেয় দিন কয়েক আগে বিবিসি-র এক সাক্ষাৎকার। যেখানে রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ আত্মঘাতী মার্কিন ধনকুবের জেফ্রি এপিস্টেইনের পক্ষে সওয়াল করেন। এতে এতটাই সমলোচনার ঝড় ওঠে যে ব্রিটিশ রাজপরিবারের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা এবং ঐতিহ্য, রক্ষণশীলতার দিকে অনেকে আঙুল তুলতে শুরু করেন। ব্রিটেনে আদৌ রাজপরিবারের দরকার আছে কি না তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি রাজধর্ম পালন করা ছাড়া যে তাঁর সামনে আর কোনও রাস্তা খোলা নেই তা বুঝেই গিয়েছিলেন রানি এলিজাবেথ। তাই দেরি না করেই. বুধবার রাতে ছোট রাজকুমারকে রাজপরিবারের সমস্ত দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করে দেন তিনি।  সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে যে বড় রাজকুমার চার্লসও রানি এলিজাবেথকে জানিয়েছিলেন, রাজপরিবারের গরিমা রক্ষায় রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-কে বহিষ্কার করা ছাড়া গতি নেই। বিবিসি-র সাক্ষাৎকারের পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে অবিলম্বে রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও নাকি রানি-কে বার্তা দেন চার্লস। 

মার্কিন ধনকুবের জেফ্রি এপিস্টেইন-কে নিয়ে গত এক বছর ধরেই বিশ্বে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কীভাবে অর্থবল ও ক্ষমতাবলকে কাজে লাগিয়ে মহিলাদের উপরে যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন এপিস্টেইন তা সামনে আসতে শুরু করেছিল। একাধিক হলিউড তারকা থেকে শুরু করে পর্নস্টার এপিস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন। একটা সময় গ্রেফতারও হতে হয় এপিস্টেইনকে। জেফ্রি এপিস্টেইন-এর যৌন কেচ্ছার জেরে জন্ম নেয় মি-টু আন্দোলন। যা ভারতের মতো দেশেও আঁছড়ে পড়েছে। এই সময় বহু মহিলা তারকাই অভিযোগ করেছিলেন শুধু জেফ্রি এপিস্টেইন নয় তাঁর বন্ধুরাও এই যৌন নির্যাতনে সামিল হত। এমনই এক বিতর্কের হাত ধরে সামনে আসেন ভার্জিনিয়া জিউফ্রে। মার্কিন এই পর্নস্টার অভিযোগ করেন এপিস্টেইনের চাপে ব্রিটেনের ছোট রাজকুমার অ্যান্ড্রিউ-র সঙ্গে তাঁকে তিনবার বিছানায় যেতে হয়েছিল। অ্যান্ড্রিউ তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ওই পর্নস্টার। এমনকী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে-র দাবি অ্যান্ড্রিউ যখন তাঁকে জোর করে বিছানায় নিয়ে গিয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। 

এরপর থেকে এক নাবালিকার উপরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হন অ্যান্ড্রিউ। কিন্তু, ছোট রাজকুমার কিছুই মানতে চাননি। এখনও তিনি রানির সিদ্ধান্তকে 'ইল জাজড'-এর তকমা দিয়েছেন। উল্টে দাবি করেছেন বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন জেফ্রি এপিস্টেইনের নির্যাতনের শিকার যাঁরা হয়েছেন তাঁদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা রয়েছে। ইচ্ছে করেই সাক্ষাৎকারের ওই অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন অ্যান্ড্রিউ। রাজপররিবারের সমস্ত দায়িত্ব থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরই একটি বিবৃতিও দেন। বার্মিংহাম প্য়ালেস থেকে তা প্রকাশও করা হয়েছে। সেখানে অ্যান্ড্রিউ তাঁর বহিষ্কারের কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে গোটা পরিস্থিতিতে তিনি ভুল বিচারের শিকার বলেও দাবি করেন। 

এদিকে, অ্যান্ড্রিউ-র বহিষ্কারের পর তাঁর থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন বিটি এবং বার্কেল ইউনিভার্সিটি। এখানে বেশকিছু স্বেচ্ছাসেবী কাজকর্ম পরিচালনা করেন অ্যান্ড্রিউ। তাঁর  কাছ থেকে পাওয়া অর্থ আর নিতে রাজি নয় বার্কলে। বলতে গেলে আস্তে আস্তে একঘরে হয়ে যাচ্ছেন রানি এলিজাবেথ-এর ছোট ছেলে অ্যান্ড্রিউ।