যত দোষ যেন বিজেপি আর ভোটারদের। বিজেপি টাকা দিয়েছে, আর ভোটাররা টাকা খেয়েছেন। তিনি কাজ করা সত্ত্বেও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে জনতাকেই বেমালুম বিশ্বাসঘাতক বানিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু একবারও কি নিজের দলের আত্মসমীক্ষা করেছেন তৃণমূল নেত্রী? নিশ্চয়ই করেছেন, কিন্তু করে থাকলেও সর্বস্বমক্ষে তা স্বীকার করার সাহস দেখাতে পারলেন না। পারলে হয়তো দলেরই মঙ্গল হতো। তার বদলে মানুষের উপরে এই একতরফা দোষ চাপানোর ফল যে মমতাকে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে ভুগতে হবে না, তা কিন্তু বুকে হাত রেখেও দাবি করতে পারবেন না অতি বড় তৃণমূল নেতা। 

অথচ এই মমতাই কিন্তু নির্বাচনের প্রচারের শেষ দিকে দলের নেতাদের একাংশের ভুলত্রুটি প্রকাশ্যেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ভোট প্রচারে বেরিয়ে তিনি হাতজোড় করে বলেছিলেন, দলের কারও উপরে রাগ করে থেকে যেন বিজেপি-কে মানুষ ভোট না দেন। যে কোনও মূল্যেই হোক নরেন্দ্র মোদীকে হারাতে হবে। দমদমের একটি সভায় তো তিনি প্রকাশ্যেই দলের হাতে থাকা কয়েকটি পুরসভার চেয়ারম্যানের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।  কিন্তু ভোটের ফল বেরোতেই সেই নেতাদের দোষত্রুটির কথা ভুলে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। উল্টে তাঁর যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়ল ভোটারদের উপরে। তাঁরাই নাকি টাকা নিয়ে বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন। এই অভিযোগ তুলে তো  মানুষের গণতান্ত্রিক মতামত প্রয়োগের অধিকারকেই অপমান করলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি হয়তো ভুলে গেলেন, রাজ্যের ৪৩ শতাংশ মানুষ তাঁর দলকে সমর্থন করেছেন। তাঁরাও কি তাহলে টাকা নিয়েই তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে, নাকি অন্য কিছুর বিনিময়ে? আর মমতা তো নিজেই বলছেন তাঁর দলের কয়েকজন নেতাও বিজেপি-র থেকে টাকা নিয়েছেন। নিজের দলের নেতাই যদি লোভ সামলাতে না পারেন, মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ কী?

অথচ এই মমতাই ভোটের প্রচারে সমানে বলে গিয়েছেন, বিজেপি টাকা দিলে নিন, কিন্তু ভোটটা তৃণমূলকে দিন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মানুষ সত্যিই আম খেয়ে আঁটিটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী ভেবেছিলেন সরকারি উদ্যোগে ঘরে ঘরে সাইকেল, কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর টাকা দিয়েই ভোট ধরে রাখা সম্ভব। কিন্তু ভেবে দেখেননি, সরকারি সেই সুবিধা পেতে গিয়ে মানুষকে দলের নেতাদের কীরকম দাদাগিরি প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হচ্ছে। আবার সাইকেল, কন্যাশ্রীর সুবিধেটা কার্যত উৎকোচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মমতা। এমন পরিবারও সেই সুবিধে পেয়েছে, যাদের এগুলি নাহলে কিছু আসে যায় না।  শনিবারের সাংবাদিক বৈঠকে তিনি অভিমানের সুরে বলেওছেন, "মানুষের জন্য একটু বেশিই কাজ করে ফেলেছিলাম।" হতেই তো পারে, তাঁর শেখানো তত্ত্ব  তাঁর দলের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করেছেন ভোটাররা। সাইকেল, কন্যাশ্রীর টাকা সব নিয়েছেন, কিন্তু ভোটটা দিয়েছেন বিজেপি-কে। আর এখানেই মমতার খতিয়ে দেখা উচিত ছিল, সত্যিই বিশ্বাসঘাতকা করে থাকলে কেন মানুষ তা করতে বাধ্য হল? 

আসলে মমতা সমীকরণটা খুব সহজ করে ফেলেছিলেন। ভেবেছিলেন পাইয়ে দেওয়ার  রাজনীতি করলেই ভোটব্যাঙ্কও ধরে রাখা সম্ভব। সেরকম হলে তো জয়ললিতা কোনওদিন ক্ষমতাচ্যুত হতেন না। দলের চুনোপুঁটি নেতাদের যে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে আর মানুষ তাতে তিতিবিরক্ত, এ খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে থাকে না, তা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু এক বিজেপি-র সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ছাড়া দুর্নীতি, দুর্ব্যবহারের প্রশ্নে সাম্প্রতিককালে কোনও নেতার বিরুদ্ধে কি বড় কোনও পদক্ষেপ নিয়েছেন মমতা?  ব্যতিক্রম শোভন চট্টোপাধ্যায়ের পারিবারিক কেচ্ছা। বরং আরাবুল ইসলামের মতো নেতাকে সাসপেন্ড করেও দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেটের বাড়বাড়ন্ত যে সহ্যের যাবতীয় সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে, পাঁচ বছরে একবারও মানতে চাননি। মানলে হয়তো মুথ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ত। যে ব্যবসায়ী, পুলিশ অফিসারদের হয়ে সওয়াল করেছেন, ধর্নায় বসেছেন, তাঁদের কেউ আজ জেলে, কাউকে গ্রেফতারের অপেক্ষায় রয়েছে সিবিআই। পঞ্চায়েত ভোটের সময় কী হয়েছে, গোটা দেশের মানুষ দেখেছে। শুধু চোখে পড়েনি মমতার। অন্ধভাবে তিনি দলের নেতাদের গায়ের জোরে পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদের দখলের ঘটনাকে সমর্থন করে গিয়েছেন। তখন যদি মমতা উদ্যোগী হয়ে পঞ্চায়েত ভোটটা ঠিক মতো করাতেন, জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ-সহ জেলায় জেলায় দলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের একটা আন্দাজ দু' বছর আগেই পেতে পারতেন তিনি। এতদিনে অনেকটা মেরামতিও হয়তো করে নিতে পারতেন। 

প্রশাসনের মাথায় বসে তাঁর কাছ থেকে রাজধর্ম পালনের আশা করেন রাজ্যবাসী। কিন্তু গত আট বছরে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার উল্টো ছবি দেখতে হয়েছে। দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, মমতা বার বার ষড়যন্ত্র বলে হয় বিরোধী নয় সংবাদমাধ্যমের উপরে দোষ চাপিয়েছেন আর দলের নেতাদের আড়াল করেছেন। ঠিক শনিবার যেভাবে তাঁদেরকে আরও একবার করলেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে বলে এখন তিনি চিৎকার করছেন, কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ কেন পশ্চিমবঙ্গে এসে করার সুযোগ পেল বিজেপি। আট বছর  ক্ষমতায় থাকার পরে এই ব্যর্থতার দায় কার? মোয়াজ্জেম ভাতার পাল্টা দিতে পুরোহিত ভাতা, প্রতিটি জনসভায় গিয়ে নিজেকে  ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা কি এত সহজে মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়? আট বছর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে থেকে কেন তাঁকে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে বার বার প্রমাণ করতে হবে? এই অপ্রিয় প্রশ্নগুলো থাকলেও তাঁর উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। উল্টে শনিবারও জোর গলায় বলেছেন, "আমি সংখ্যালঘু তোষণ করি।" হয়তো রাগ থেকেই বলেছেন, কিন্তু রাজ্যের সংখ্যাগুরুদের কাছে এই মন্তব্য কী বার্তা দিল, তা হয়তো ভেবে দেখেননি মুখ্যমন্ত্রী। ভোটের মধ্যেই  'জয় শ্রীরাম' ধ্বনি শুনে গাড়ি থেকে নেমে রাগ দেখিয়ে উল্টে বিজেপি-র হাতে নতুন প্রচারের অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। বিজেপি বলার সুযোগ পেয়েছে, মমতা 'জয় শ্রীরাম' শুনলে রেগে যান। এর পরেও দোষ ভোটারদের?

ভোটের ধাক্কা সামলাতেও আবার সেই পাইয়ে দেওয়ার পথেই হাঁটতে শুরু করেছেন তিনি। দলের নতুন, পুরনো যে সাংসদরা হেরেছেন, তাঁদেরকেও কোনও না কোনও পদে বসিয়ে পুরস্কৃত করেছেন তিনি। কিছুই না, দলে ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু পরাজিত সাংসদদের কি একবারও জিজ্ঞেস করেছেন, পাঁচ বছর সাংসদ থেকেও কেন বিশ্রীভাবে ভোটে হারতে হলো, মানুষের জন্য জনপ্রতিনিধি হিসেবে যা করা উচিত ছিল তা কি তাঁরা করেছেন? শহরতলির পুরসভায় পাঁচ বছর কাউন্সিলর হয়েই দলের নেতারা  কীভাবে তিনতলা বাড়ি আর চার চাকা গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সে খবর জেনেও কি এখনও না জানার ভান করে থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী? উল্টে মমতার শনিবারের সাংবাদিক সম্মেলনের পরে দলের ছোটবড় নেতারা কেউ কেউ একই সুরে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষকে দুষতে আরম্ভ করেছেন। ভাবখানা এমন যেন, মানুষে বিচার বিবেচনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার লাইসেন্স তাঁরা কালীঘাট থেকে পেয়ে গিয়েছেন। শনিবার সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী দলের নেতাদের বলতে পারতেন, যে আরও বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। উল্টে তিনি এমন বক্তব্য রাখলেন, যেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য মানুষকেই তাঁর দলের নেতাদের পিছনে ছুটতে হবে!

ভোটের ফল প্রকাশের পরে সব দলই বলেছে, তারা মানুষের রায় মাথা পেতে নিচ্ছে। মমতা তা বলার প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনি উল্টে দায় চাপিয়েছেন মানুষের উপরেই। দলের নেতারাও বুঝে গেলেন, যাই করি না কেন, এক বিজেপি-র সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলে দলের মধ্যে বিশেষ চাপ নেই। তাই মানুষ শিক্ষা দিতে চাইলেও মমতার প্রশয়ে শাসক দলের নেতারা কতটা শিক্ষা পেলেন, সেই প্রশ্ন থাকছেই। চোখে আঙুল দিয়ে মানুষ যা দেখাতে চাইলেন, মমতা হয়তো দেখেও তা দেখলেন না। এর পরের বার মানুষকে কিন্তু আর সত্যিই হয়তো দোষ দেওয়া যাবে না।