বিরোধী নেত্রী হিসেবে অনেক ঝড় ঝাপ্টা সামলেছেন। মাত্র একজন সাংসদ নিয়েও লড়ে গিয়েছেন সিপিএমের সঙ্গে। ২০০৬-এর নির্বাচনে বিপর্যয়ের পরেও গড়ে তুলেছেন সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের মতো আন্দোলন। পাঁচ বছরের মধ্যে ক্ষমতা দখল করে গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। 

বাম সরকারের অবসানে তাঁর আন্দোলন ইতিহাসের পাতায় জায়গায় করে নিলেও শাসক মমতা সম্ভবত এই প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে পড়লেন। একসঙ্গে এবার জোড়া পরীক্ষা তাঁর। একদিকে বিজেপি বাড়বাড়ন্ত রুখে ক্ষমতা ধরে রাখা, অন্যদিকে বিজেপি-র আগ্রাসনের সামনে নিজের দলকে ভাঙতে না দেওয়া। 

অতি উৎসাহী বিজেপি নেতারা কটাক্ষের সুরে বলতে শুরু করেছেন, তৃণমূল দলটাই আর থাকবে না। অন্তত একশোজন তৃণমূল বিধায়ক নাকি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দলের একটা বড় অংশ যে বিজেপি-র দিকে ঝুঁকে পড়েছে, মমতার থেকে ভাল কেউ জানেন না। এই অবস্থায় মমতার ক্ষুরধার রাজনৈতিক মস্তিষ্কের ফের একবার কঠিন পরীক্ষা। টাটাকে সিঙ্গুর ছাড়া করার মতো অতীতে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজ্যের ভাল মন্দের উপর যে প্রভাবই ফেলে থাকুক না কেন, তাঁকে এবং তাঁর দলকে যে রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড দিয়েছে, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাই কঠিন পরীক্ষা মমতার জন্য। একদিকে তা হয়তো মমতার পক্ষে ভালই হবে। প্রকাশ্যে এতদিন তাঁকে মাথায় তুলে রাখলেও তাঁর প্রকৃত বিশ্বস্ত সৈনিক কারা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই হয়তো তার হাতেনাতে মালুম পাবেন মমতা। 

মমতার জন্য ভয়ের অনেক কিছুই আছে। গোটা দেশের দিকে তাকালেই স্পষ্ট, বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ধুঁকছে। ২০১৪ সালে উত্তর প্রদেশে লোকসভা নির্বাচনে সপা-বসপাকে যে ধাক্কা দিয়েছিল বিজেপি, পাঁচ বছরে তা সামলে উঠতে পারেননি অখিলেশ-মায়াবতী। একজোট হয়েও বিজেপি-র সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছেন না তাঁরা। এই অবস্থায় এখনই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র বৃদ্ধি আটকাতে না পারলে পাঁচ বছর বদে তাঁর অবস্থাও যে অখিলেশ, মায়াবতীর মতো হবে না, তা কে বলতে পারে?

বিরোধী নেত্রী হিসেবে তাঁর কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। প্রশাসক মমতার তা রয়েছে। বিধানসভা ভাঙচুর হোক বা সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আন্দোলন, যখন যা মনে হয়েছে, সেটাই তিনি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও অবশ্য সিবিআই-এর বিরুদ্ধে ধর্নায় বসেছেন। কিন্তু বার বার তো তা করতে পারবেন না। করলেও প্রশাসক মমতার বিরুদ্ধে প্রচারের অস্ত্র পেয়ে যাবে বিজেপি। বিজেপি-কে সামলাতে তাই রাজনৈতিক চালের উপরেই বেশি ভরসা করতে হবে মমতাকে। দু' বছরের মধ্যে নতুন করে সুশাসক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। তিনি ছাড়া দলের বাকি মাথাদের উপরে যে বিশেষ ভরসা করা যায় না, এবারের নির্বাচনেই তা হাতেনাতে মালুম পেয়েছেন মমতা। ফলে, ৩৪ বছরের বাম সরকারকে সরানোর লড়াইটা যেমন তিনি একাই লড়েছিলেন, তেমনই বিজেপি-কে আটকে নিজের গড় সামলানোর লড়াইটাও একাই লড়তে হবে তৃণমূল নেত্রীকে। 

সিপিএমের মতো ক্যাডার ভিত্তিক দলের সংগঠন গুঁড়িয়ে দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, এবার সেই একই সঙ্কটের মুখোমুখি তাঁর নিজের দল। বিপক্ষেও এবার আরও একটি সংগঠন ভিত্তিক দল। শুধু গড় দখলের বদলে মমতার গড় বাঁচানোর লড়াই মমতার, লালের বদলে বিপক্ষে গেরুয়া।