লোকসভা নির্বাচন ২০১৯-এর ভোটগ্রহণ পর্ব চলছে। আর এই রাজনৈতিক উত্তেজনার আঁচ বাড়তেই প্রতিদ্বন্দ্বী মহিলা প্রার্থীর অন্তর্বাসের রঙ নিয়ে মন্তব্য থেকে 'প্রধানমন্ত্রী পাজামাও পরতে জানতেন না' গোত্রের কুকথার ফুলকি ছুটছে। বরাবরের বিতর্কিত সপা নেতা আজম খান থেকে সিনিয়র কংগ্রেস নেতা কমল নাথ, তার ভাগীদার।

সবচেয়ে বেশি কুকথার নিশানা অবশ্যই কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের শীর্ষনেতা থেকে তারকা প্রচারক সবাইই কুরুচিকর ব্যক্তিগত আক্রমণের সম্মুখীন হচ্ছেন। সম্প্রতি এক জনসভায় গত মাসেই বিজেপি-তে যোগ দেওয়া অভিনেত্রী তথা প্রাক্তন সমাজবাদি পার্টি নেত্রী জয়া প্রদাকে উদ্দেশ্য করে তাঁর অন্তর্বাসের রঙ নিয়ে মন্তব্য করেন আজম খান। এরপরই ইলেকশন কমিশন ও মহিলা কমিশন নোটিশ পাঠিয়েছে তাঁকে। পুলিশ এফআইআর-ও করেছে। তাঁর দলেরই আরেক নেতা আবার বলেছেন, জয়া প্রদার রোড শো-তে তাঁর 'ঠুমকা' দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।

মুম্বইতে কংগ্রেসের প্রার্থী হওয়া উর্মিলা মার্তণ্ডকারকেও লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য ও তাঁর আন্তর্ধর্ম বিবাহ নিয়ে কটু মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে।

কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর সময়ের কথা বলতে গিয়ে কংগ্রেস নেতা কমলনাথ আবার বলেছেন তখন 'প্যান্ট-পাজামা পরতে জানতেন না প্রধানমন্ত্রী মোদী'। সেই নিয়েও সমালোচনা কম হয়নি।

হিমাচল প্রদেশের বিজেপি প্রধান সতপাল সিং আবার খোলাখুলি অভিশাপ দিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে। আরেক বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার প্রশ্ন তুলেছেন রাহুলের পিতৃত্ব নিয়ে। তিনিই এর আগে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর উদ্দেশ্যে সুন্দরী প্রচারকারী বলে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। বিহারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী চৌবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রাবরি দেবীকে ঘোমটার আড়ালে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কেরলের বিজেপি প্রধান পিএস শ্রীধরণ পিল্লাই আবার 'প্যান্ট খুললেই মুসলমানদের চেনা যায়' বলে সমালোচিত হয়েছেন।

কুকথা বলার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞার নোটিশ পেতে হয়েছে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধী, বসপা সুপ্রিমো মায়াবতী - প্রত্যেককেই। কেউ কিন্তু এখনও কোনও  টমা চাওয়ার ধার ধারেননি।

অর্থাত দেখা যাচ্ছে জায়গা ও দল নির্বিশেষে কুকথা বলতে বা ঘৃণামূলক বক্তব্য রাখতে পারদর্শী প্রায় সব রাজনৈতিক নেতাই। কিন্তু, কুকথা বলে বা ঘৃণা ছড়িয়ে সমালোচিত হয়ে তাদের লাভ কী?

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচার ব্যবস্থাপক হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা বলছেন, এতে ওপরে ওপরে সমালোচিত হলেও আখেরে ভোটের রাজনীতিতে লাভই হয়। এক ঢিলে রীতিমতো দুই পাখি মারা যায়। একদিকে এই ঘৃণা-ভাষণে ভোটারদের মেরুকরণ করা যায় সহজে। অপরদিকে নেতিবাচকভাবে হোক কি ইতিবাচকভাবে এই ধরণের বক্তব্যের ভিডিও দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যায়। তাতে প্রচারের ক্ষেত্রে অনেক লাভ হয়ে থাকে।

কাজেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রীতিমতো পরিকল্পনা করেই এই ধরণের মন্তব্য করে থাকেন রৈজনৈতিক নেতারা। কোনক্ষেত্রে নেতারা ব্যক্তিগত স্তরে কৌশল স্থির করে থাকেন, আবার কখনও কখনও দলের তরফেও কুকথায় প্রচার পাওয়ার নির্বাচনী কৌশল তৈরি করা হয়। ভোট ম্যানোররা বলছেন কোনও কোনও নেতার কুকথার বিষয়টি সহজাত, বাকিরা একটু হলেও অস্বস্তিতে পড়েন।

তবে, এই বারের ভোটে এই রণ কৌশল কতটা খাটবে তাই নিয়ে কিন্তু সন্দিহান স্বাধীন রাজনৈতিক যোগাযোগ পরামর্শদাতা অনুপ শর্মা। এই বারেই একবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া ভোটাররা প্রথমবার মতদান করবেন - এই দিকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর মতে রাজনৈতিক দলগুলির বোঝা উচিত আজকের ভোটারদের বিশেষ করে যুব ভোটারদের, দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্মক ধারণা রয়েছে। তারা জাতপাত নয় বরং চাকরি ও উন্নয়নের মতো বাস্তব সমস্যাগুলি নিয়ে ভাবিত। ১৮-১৯ বছরের যে দেড় কোটি জেন জেড এইবারই প্রথম ভোট দেবে তারা অনেক বেশি সচেতন, খোলা মনের এবং তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাও অনেক বেশি।