ভারতীয় সিনেমায় অসামান্য অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা অনন্ত নাগ। গুজরাটের কেভাদিয়ায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিজের দীর্ঘ অভিনয় জীবনের নানা কথা তুলে ধরেন তিনি।
বর্ষীয়ান অভিনেতা অনন্ত নাগ ২২ সেপ্টেম্বর গুজরাটের কেভাদিয়ায় আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা পুরস্কার ঘোষণার ঠিক আগেই তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের নানা মুহূর্ত নিয়ে একটি বিশেষ ট্রিবিউট ভিডিও দেখান।
দাদা সাহেব ফালকে সম্মান পেলেন অনন্ত নাগ
অনন্ত নাগ যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন গোটা অডিটোরিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানায়। মামুট্টি, ধনুশ, সঞ্জয় মিশ্র, ইয়ামি গৌতম, আদিত্য ধর এবং কার্তিক আরিয়ানের মতো তারকারাও সেখানে উপস্থিত থেকে তাঁকে হাততালি দিয়ে সম্মান জানান।

অনন্ত নাগ মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনেতা, পরিচালক ও সিনেমা জগতের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে নিজের পাঁচ দশকের কেরিয়ারের স্মৃতিচারণ করেন। অনন্ত নাগ বলেন, কর্ণাটক তাঁর 'কর্মভূমি' আর ভারত তাঁর 'ধর্মভূমি'। তাঁর অভিনয়ের শুরু মাত্র ১২ বছর বয়সে মুম্বইয়ে থিয়েটারের হাত ধরে। বর্ষীয়ান এই অভিনেতা পুরস্কার নেওয়ার পর সেই শুরুর দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, "আপনাদের সবার সঙ্গে এখানে থাকতে পেরে আমি সত্যিই খুব সম্মানিত। এত বড় একটা অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য আমি এখনও হজম করার চেষ্টা করছি। এর আগে আমি খুব বেশি এমন অনুষ্ঠানে আসিনি, হয়তো আসিনি বললেই চলে। তবে আজ আপনাদের মাঝে এসে আমার ভীষণ ভালো লাগছে।"
অনন্ত নাগ আরও বলেন, "আমি ১২ বছর বয়স পর্যন্ত একটা আশ্রমে বড় হয়েছি। তারপর আমাকে মুম্বই পাঠানো হয়। আমি সেখানে একটা নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পাই, আর সেখান থেকেই আমার পথচলা শুরু। তবে তখন ওটাকে কেরিয়ার বলা যায় না, কারণ ভবিষ্যতে কী হবে সে বিষয়ে আমার কোনও ধারণাই ছিল না।"
তিনি জানান যে থিয়েটারে কাজ করাটাই তাঁর কাছে ভারতীয় সিনেমায় পা রাখার 'ট্রেনিং গ্রাউন্ড' বা প্রস্তুতির জায়গা ছিল। তবে কিছুদিন পর তিনি কন্নড় সিনেমাতেই নিজের কেরিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তাঁর কথায়, "এরপরই অভিনেতা হিসেবে আমার আসল কেরিয়ার শুরু হয়। আমি পাঁচ বছরে প্রায় ৫০টা আলাদা আলাদা নাটকে অভিনয় করি। ওটাই ছিল আমার শেখার জায়গা। তারপর আমি সিনেমায় অভিনয়ের ডাক পাই। প্রথমে কন্নড় ছবিতে, তারপর শ্যাম বেনেগাল সহ আরও অনেকের সঙ্গে হিন্দি ছবিতে কাজ করি।"
তিনি আরও বলেন, "আমি অনেক হিন্দি ছবিতে কাজ করলেও, কর্ণাটকে নতুন যুগের সিনেমা, কমার্শিয়াল ছবি আর অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বেশ ভালো ছিল। তাই ভাবলাম, বেঙ্গালুরুতেই পাকাপাকিভাবে থাকা যাক। আর সেটাই আমার কর্মভূমি হয়ে উঠল। অন্য ভাষার ছবিতেও আমাকে ডাকা হতো, আর আমি সেখানে কর্ণাটকের একজন প্রতিনিধি হিসেবেই যেতাম।"
'অঙ্কুর' খ্যাত এই অভিনেতা তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারে দর্শকদের ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি তাঁর এই সফল যাত্রায় পরিচালক, প্রযোজক ও টেকনিশিয়ানদের অবদানের কথাও স্বীকার করেন।
অনন্ত নাগ বলেন, "এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি সেই সব মানুষদের কথা মনে করতে চাই, যাঁরা গত ৫০-৫৫ বছর ধরে আমার সঙ্গে ছিলেন। এই পুরস্কার শুধু আমার একার নয়। পরিচালক, প্রযোজক, কস্টিউম ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, সহকারী পরিচালক, চিত্রনাট্যকার থেকে শুরু করে যাঁরা আমার সঙ্গে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, এ পুরস্কার তাঁদের সবার।"
"গত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ আমার অভিনীত চরিত্রগুলোকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছেন, এই সম্মান তাঁদেরও," যোগ করেন তিনি।
অনন্ত নাগ কর্ণাটক এবং দেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা তুলেই নিজের বক্তব্য শেষ করেন।
তিনি বলেন, "এই মহান দেশ আমার জন্মভূমি, কর্ণাটক আমার কর্মভূমি আর ভারত আমার ধর্মভূমি। আরও একবার আপনাদের সবাইকে, ভারতের সব মানুষকে ধন্যবাদ জানাই, যাঁরা সবসময় আমার পাশে থেকেছেন।"

ভারতীয় সিনেমায় ৫ দশকেরও বেশি সময় কাজ করেছেন অনন্ত নাগ
এই দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অনন্ত নাগের বর্ণময় সিনেমাটিক জার্নিকে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর এই যাত্রা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং দেশের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
অনন্ত নাগের জীবনের চালচিত্র
অনন্ত নাগ ১৯৪৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কর্ণাটকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গত পাঁচ দশক ধরে ভারতীয় সিনেমায় তাঁর বহুমুখী অভিনয় এবং অবদানের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি হয় কন্নড় ছবি 'সংকল্প' দিয়ে। হিন্দিতে তাঁর প্রথম ছবি ছিল 'অঙ্কুর'। তিনি এরপর কন্নড়, হিন্দি, তেলুগু, মালয়ালম, তামিল এবং মারাঠি মিলিয়ে প্রায় ৩০০টিরও বেশি ছবিতে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে 'মালগুড়ি ডেজ'-এর মতো জনপ্রিয় কাজও রয়েছে।
তিনি নিজের কেরিয়ারে পাঁচটি ফিল্মফেয়ার এবং পাঁচটি কর্ণাটক রাজ্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন। তিনি কর্ণাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার, কর্ণাটক সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার এবং কর্ণাটক রাজ্য লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় (নর্থ) তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধিও দিয়েছে।
তিনি ২০২৩ সালে সিনেমায় তাঁর ৫০ বছরের কেরিয়ারের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করেন। তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল সিনেমার বাইরে রাজনীতির ময়দানেও। তিনি ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত কর্ণাটক বিধান পরিষদের সদস্য এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সেই সময় বেঙ্গালুরু শহর উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। ভারত সরকার ২০২৫ সালে তাঁকে 'পদ্মভূষণ' সম্মানে ভূষিত করে।
অনন্ত নাগ বহুমুখী প্রতিভা, নম্র স্বভাব এবং ভারতীয় সিনেমায় তাঁর চিরস্থায়ী অবদানের জন্য আজও ভারতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় এক সাংস্কৃতিক আইকন।
দাদাসাহেব ফালকে ১৯১৩ সালে ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ফিচার ফিল্ম 'রাজা হরিশচন্দ্র' পরিচালনা করেছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় সিনেমায় তাঁর এই অবদানকে স্মরণ করতেই ১৯৬৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার চালু করে। দেবিকা রানি প্রথমবার এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।
এই পুরস্কার সিনেমা জগতের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে ভারতীয় সিনেমার বৃদ্ধি ও বিকাশে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দেয়। প্রাপকরা এই পুরস্কারের সঙ্গে একটি স্বর্ণকমল পদক, একটি শাল এবং ১০ লক্ষ টাকা নগদ পান।
