অলি রাহা: ২০১৯ এর ১২ আগস্ট। ইদ উপলক্ষে অফিস ছুটি।  সাংঘাতিক ব্যস্ত ঘরোয়া কাজে। একটা অচেনা নম্বর থেকে আচমকা ফোন এল আমার নম্বরে। বলা ভালো ব্যস্ততার মধ্যে অচেনা নম্বরের ফোন দেখে কিছুটা বিরক্তও হয়েছিলাম। বিরক্তি সহকারে ফোনটা তুলতেই তাজ্জব বনে গেলাম আমি। ফোনের ওপারে এক মহিলাকন্ঠ- 'আরতিদি বলছি।'--'কে আরতি দি? আমি কোনও আরতিদিকে চিনি না।' -- 'আরে শেফালিদি বলছি। তুমি অলি তো?'-- 'হ্যাঁ আমি অলি। কিন্তু আপনি শেফালিদি মানে? মিস শেফালিদি?' -- 'হ্যাঁ চিনতে পেরেছো?'

ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় বছর আটেক আগে। তখন আমি কলকাতার প্রথমসারির একটি সংবাদপত্রে চাকরি করি। ওঁর একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম আমি। মনে পড়ল, তখন ওঁর ডায়েরিতে আমি নাম, ফোন নম্বর লিখে দিয়েছিলাম।  বললাম, 'হ্যাঁ দিদি বলুন এতদিন পর! কেমন আছেন?' অভিমানের সুরে বললেন, 'তুমি তো কোনো খোঁজ খবরই নাও না আমার।'  সরাসরি বললেন, 'জানো আমার খুব টাকার দরকার। মাসে ১০০০ টাকার ওষুধ লাগে। সেই টাকা জোগাড় করতে পারছি না। তুমি কোনও কাগজে আমার একটা ইন্টারভিউ বের করতে পারো? যদি টাকার কোনও বন্দোবস্ত হয়।'  সেদিন বিকেলেই  প্রথম সারির সংবাদপত্রের এক সাংবাদিকের সঙ্গে দমদম নাগেরবাজারে ওঁর দু-কামরার ফ্ল্যাটে যাই। সঙ্গে নিই কিছু জামাকাপড়, মিষ্টি আর হাজার কয়েক টাকা। ব্যক্তিগত ভাবে আমি এর বেশি কী বা করতে পারি? অনেকক্ষণ কথা হয় সেদিন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার তাঁর জন্য কিছু করেনি। কোনও সংস্থাও এগিয়ে আসেনি সেভাবে। আমি কথা দিই আমার তরফ থেকে ব্যক্তিগত ভাবে যতটুকু করা সম্ভব করব। সেদিন রাতেই রাজ্য সরকারের এক বিশিষ্ট মন্ত্রীকে ওঁর অভিযোগের ভিডিও পাঠাই হোয়াটসঅ্যাপে। সেদিন ছিল সোমবার। সেই ভিডিও দেখে অতি দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ করেন সেই মন্ত্রী । 

ঠিক হয়, শুক্রবার সল্টলেকের সরকারি দপ্তরে গিয়ে কিছু সই-সাবুদ করতে হবে মিস শেফালি ওরফে আরতি দাসকে। তা হলেই প্রতি মাসে মিলবে সরকারি বার্ধক্যভাতা। সেই মতো শেফালিদির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মন্ত্রীকে কনফার্মও করি। কিন্তু শুক্রবার সকালে শেফালিদি ফোন করে জানায় ওঁর সঙ্গে ওঁর কোনও পরিচিত যেতে চাইছেন না। তাই উনি যাবেন না। কারণ, বিভিন্ন রাস্তা নাকি জলমগ্ন।  আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। আমি বার বার বোঝাবার চেষ্টা করলাম মন্ত্রী আমার এক কথায় এতটা উদ্যোগী হয়ে পুরো ব্যাপারটা নিজে থেকে করলেন। আর আপনি এখন বলছেন যাবেন না?এমনকি এও বললাম, মন্ত্রী বলেছেন, আপনি সশরীরে না গেলেও চলবে। আপনার অথোরাইজ করা চিঠি নিয়ে আপনার বিশ্বাসভাজন কেউ গেলেও হবে। শেফালিদি একটাই কথা বললেন, কারও কাছে আমার জন্য যদি এতটুকু সময় না থাকে তা হলে আমি কী করব? শেষের দিকে থেকে থেকেই ভুলে যেতেন। কথার খেই হারিয়ে ফেলতেন। শেষ বয়সে মলদ্বার দিয়ে শরীরের রক্ত বেরিয়ে যেত তাঁর। রক্ত নিতে প্রায়শই ছুটতে হত হাসপাতালে। 

নিজে সংসার করতে পারেননি কিন্ত নিজের উপার্জনের টাকায় বিয়ে দিয়েছেন অসংখ্য মেয়ের। এক সাহেবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা-মাকে ফেলে একলা বিদেশ যেতে চাননি। পারিবারিক কিছু সমস্যাও ছিল।  শেষ বয়সে পাড়ার এক শুভানুধ্যায়ী ওঁর মাসের বাজার করে দিতেন।  ফোন করলে একটা কথাই বলতেন, আমার কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দিতে পার? মাঝে মধ্যে রাগও হত। সরকারি ভাতা হেলায় হাতছাড়া করলেন। আপনার নিজের লোকজনই তো... যাই হোক সব সব কথা।  শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় ওঁর জীবনী নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখান থেকে কিছু আর্থিক সাহায্য হয়েছিল। ওঁর জীবনী নিয়ে ছবি হওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। 

এক সময় লাখ লাখ টাজা উপার্জন করেছেন একা হাতে। হিরে জহরতের গয়না কম ছিল না তাঁর। সবই বিলিয়ে দিয়েছিলেন বলে শুনেছি। মনের দিক থেকে ছিলেন খুবই নরম স্বভাবের। আজ বৃহস্পতিবার সোদপুরের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এক সময়ের দেশের অন্যতম সেরা ক্যাবারে শিল্পী মিস শেফালি। মৃত্যকালে ওঁর বয়স হয়েছিল... না উনি নিজের বয়স জানাতে চাননি কোনও দিন।

 


(দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত অলি রাহা। কাজ করেছেন প্রথম সারির একাধিক সংবাদমাধ্যমে। বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট সংবাদিকতা করছেন তিনি।)