তপন মল্লিক, কলকাতাঃ  দুনিয়ার প্রতিটি জেগে ওঠার গল্প একই রকম নয়। তবে সব সফল গল্পের আড়ালে থাকে কঠিন বাস্তব। হয়ত সেই বাস্তবতাই সফল ব্যক্তির সাফল্যকে সমৃদ্ধ করে। আর সেই গল্প শুনতে শুনতেই আমরা সেই ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়ি, গৌরব অনুভব করি। কীর্তিমান ব্যক্তির জনপ্রিয়তার পিছনের গল্পও সেই একই তারে বাঁধা। একের পর এক প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়েই সে ইতিহাসের পাতায় তাঁর কৃতিত্বের কাহিনি লিখে যায়। ‘কিং অব রক’ এলভিস প্রিসলি যে ‘কান্ট্রি' দিয়ে শুরু করে পরে ‘রিদম অ্যান্ড ব্লুস’ তারপর ‘রক এন রোল'-এর ছন্দে আর মূর্ছনায় দু’দশক ধরে গোটা দুনিয়াকে মাতালেন সেই সাফল্যের গল্পও তো তাই। শুধু তো তাঁর নিজের সময় নয়, পরবর্তী প্রজন্মকেও প্রভাবিত করেছেন রক অ্যান্ড রোলের রাজা এলভিস প্রিসলি। আর শুধু কি তাঁর গান দিয়ে, ব্যক্তিত্বের আবেদন, পোশাক, স্টাইল সব মিলিয়ে এলভিস ছিলেন ষাট আর সত্তরের দশকের প্রতিনিধি। 

গরিব সংসারের ছেলে এলভিস জীবিকার জন্য ট্রাক চালিয়েছেন এক সময়। কিন্তু গান থামান নি। সেই যে বাবা-মার সঙ্গে চার্চে গিয়ে গান গাইতেন সেটা অন্তরে আগলে রেখেছিলেন। তারপর একদিন নেহাত শখের বসেই মেমফিস স্টুডিওতে গিয়ে নিজের পয়সায় কিছু গান রেকর্ড করেন, মাকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য।

বছরখানেক বাদে সেই মেমফিস স্টুডিওর মালিক স্যাম ফিলিপস এলভিসকে ডেকে পাঠালেন। এলভিসকে দিয়ে বেশ কিছু গান রেকর্ড করালেন। সেই গানগুলির মধ্যে ছিল কান্ট্রি, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ। এলভিস একের পর এক সেই সব গান গেয়ে এলভিস স্টুডিওর মানুষদের একেবারে সম্মোহিত করে ফেলেন। শুরু হয়ে যায় একটি নতুন অধ্যায়।

 

জীবনে প্রথম শো’ যেমন পেলেন তেমনই শো-এর শেষে সেখানকার ম্যানেজার জিমি ড্যানি এলভিসকে চাকরিচ্যুত করলেন। জানা যায় ড্যানি নাকি এলভিসকে বলেছিলেন, ‘তুমি একজন নন-পারফর্মার, গানের বদলে তুমি বরং ট্রাক চালানো শিখে নাও। উন্নতি করতে পারবে’। ঠিক এই রকম একটা জায়গা থেকেই এলভিস তাঁর সঙ্গীত জীবনের পরবর্তী অধ্যায়গুলি লিখতে শুরু করেন। মাতিয়ে দেন গোটা সঙ্গীতবিশ্ব।

‘লাভ মি টেন্ডার' এই গান দিয়েই এলভিস রক এন্ড রোল সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। প্রথম একক অ্যালবাম ‘হার্ট ব্রেক হোটেল’ মুক্তির পর পরই বদলে যায় তার জীবন। এলভিসের একটি ব্যান্ডও ছিল- ‘দ্য ব্লু মুন বয়েজ’। 

আমেরিকার সাদা ও কালোদের মধ্যে সংস্কৃতিগত ফারাক বা দূরত্বকে এলভিসই প্রথম তার গানে এক সুতোয় বাঁধতে চেষ্টা করেন। এলভিসের জন্ম এবং বেড়ে ওঠার সময় আমেরিকায় বর্ণবাদ ছিল চরম। বিশেষ করে এলভিস যেখানে বেড়ে উঠেছেন সেই দক্ষিণাঞ্চলে। এলভিস শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের সামনে ব্ল্যাক মিউজিককে বেশি বেশি করে তুলে ধরেন। যে সব গান, গায়কী এলভিস তাঁর শৈশব-কৈশোর থেকে শুনে এসেছেন, সেগুলি তাঁর ভিতরে ছিল। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান বিশেষত যারা একটু বয়স্ক তারা বরাবরই বর্ণবাদী ছিলেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুন শ্বেতাঙ্গদের কাছে এলভিস পৌঁছে যান তাঁর গান নিয়ে। গানের পাশাপাশি তাঁর স্টাইল, বিশেষ করে স্টেজ পারফরম্যান্স মারফত তিনি কিশোর থেকে তরুনদের মন ছুঁয়ে ফেলেন। তখন এলভিস যত কিশোর-তরুনদের কাছাকাছি যাচ্ছিলেন ততই আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ সমাজ, মিডিয়া, চার্চ এলভিসের সমালোচনা করতে থাকে। আসলে এলভিস বর্ণবাদী এবং রক্ষণশীল আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ সমাজের ওপর বেশ জোরেই আঘাত হেনেছিলেন। সে কারণে বয়স্ক শ্বেতাঙ্গরা এলভিসকে যেমন ঘৃণা করেছিল তরুন সমাজ ততটা ভালোবেসেছিল। তরুনদের কাছে এলভিস হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতার প্রতীক, নিজের মতো করে চলার অনুপ্রেরণা। মেয়েরা এলভিস বলতে পাগল, আর সব ছেলেরা চাইত এলভিসের মত হতে!

 

এলভিসের গানের মধ্যে দিয়ে শুধু যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবই ঘটেছে তা নয়। সামাজিক পরিবর্তনও ঘটেছে। সেটা ঘটেছে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান তরুনদের মধ্যে। আমেরিকায় সেই সময় বর্ণবাদ ছিল ঠিকই কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দেশটি ক্রমাগত এগিয়ে চলছিল। আমেরিকার তরুন সমাজ সেই সময় থেকেই তাদের বাবা-মার পুরোনো ধ্যান ধারণা মেনে চলতে রাজি হচ্ছিল না। তারা নিজেদের স্টাইল, নিজেদের জীবন যাপনের ধরণ ধারণ নিজেরাই ঠিক করে নিচ্ছিল। নিজেদের মতামত প্রকাশ করছিল কোনও দ্বিধা না রেখেই। আমেরিকার তরুনদের মধ্যে এই স্বাধীনচেতা মনোভাব ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এলভিস তাঁর গান ও লাইফস্টাইল দিয়ে।

কালক্রমে এলভিস শুধু আমেরিকার তরুনদেরই নন, সারা বিশ্বের তরুনদের কাছে আইকন হয়ে ওঠেন। মেয়েরা তখন এলভিস প্রিসলি বলতে পাগল। তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েত দেখা করবার জন্য। কাছাকাছি যারা পৌঁছেছিল, তারা প্রিসলির জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলছিল। আর যারা তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি, তারা প্রিসলির সাদা লিঙ্কন কন্টিনেন্টাল গাড়ির শরীরজুড়ে তাদের ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে যেত। স্টেজ, টেলিভিশন, সিনেমা সর্বত্র এলভিসের প্রভাব ছিল সর্বগ্রাসী। ৩১টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।