19

ক্রিসমাসের ঠিক আগের দিন, নেপালের কাঠমান্ডু থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে আসার জন্য ওই অভিশপ্ত বিমানে উঠেছিলেন যাত্রীরা। কিন্তু ভারতীয় আকাশে প্রবেশের পরই পাঁচজন সশস্ত্র জঙ্গি কেবিন ক্রু এবং পাইলটদের মাথায়. বন্দুক ঠেকিয়ে বিমানটিকে পশ্চিমে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু বিমানের ক্যাপ্টেন দেবী শরণ বিমানের গতি ৪০ শতাংশ কমিয়ে, জ্বালানি কমের অজুহাতে বিমানটিকে অমৃতসরে অবতরণ করিয়েছিলেন।

 

Subscribe to get breaking news alerts

29

ইতিমধ্যে খবর গিয়েছিল নয়াদিল্লিতে, তৈরি হয়েছিল একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাবিনেটন সচিব প্রভাত কুমার। এছাড়া 'র' প্রধান এ.এস. দুলাত, এনএসজি প্রধান,  উপ প্রধানমন্ত্রী এল কে আদবানি; বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিং; অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী শরদ যাদব এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা অরুণ শৌরি ছিলেন সেই দলে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ছিলেন না প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ। প্রায় ১০০ মিনিট পর জানানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী-কে।

 

39

বস্তুত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছিল বলে জানা যায়। বিকেল ৪.৪০ মিনিটে ঘটনা সম্পর্কে জেনেছিল সরকার। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ (সিএমজি) বৈঠকে বসে সন্ধ্যা সন্ধ্যা ৬টায়। সন্ধ্যা ৭.১০-এর মধ্যেই এনএসজি অমৃতসরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেও, সিএমজি থেকে তাদের অনুমোদন আসে সন্ধ্যা ৭.৪০ মিনিটে। তার ১৫ মিনিটের মধ্যেই এনএসজি রওনা দিলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। জ্বালানী ভরতে দেরি দেখে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল জঙ্গিদের মনে। পণবন্দিদের হত্যার হুমকি দিয়ে তারা পাইলটকে যাত্রা শুরু করতে বাধ্য করেছিল। বিমানটি উড়ে যাওয়ার এক ঘন্টা পর অমৃতসরে পৌঁছেছিল এনএসজি কমান্ডোরা।

 

49

জ্বালানী না ভরেই অমৃতসর ছেড়েছিল বিমানটি। লাহোর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিমানটিকে পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করার অনুমতি না দিলেও, পরে বিদেশমন্ত্রী জসবন্ত সিং-এর অনুরোধে তারা বিমনটিকে লাহোরে নামতে দেয়। তবে শরত ছিল জ্বালানি ভরে অবিলম্বেই তাদের আকাশসীমা ছাড়তে হবে। এরপর ভারত সাহায্য চেয়েছিল আমেরিকার কাছে। তাদের চাপে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বিমানটিকে দুবাইতে নামার অনুমতি দেয়। ছিনতাইকারী জঙ্গিরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিমানটি অবতরণ করলে তারা ৭০ জন মহিলা এবং শিশুদের মুক্তি দেবে। পরিবর্তে তারা ১ পুরুষ যাত্রীর মৃতদেহ সহ ২৬ জনকে মুক্তি দেয়।

 

59

ক্রিসমাসের সময় বলে আমেরিকানদের কাছ থেকে কোনও সহায়তাই মেলেনি। ভারত সরকার আমিরশাহি-কে অনুরোধ করেছিল বিমানটিতে সামরিক অভিযানের জন্য, কিন্তু তারা সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেয়। এরপর ভারতের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আইসি ৮১৪-কে আফগানিস্তানের কান্দাহার-এ উড়িয়ে নিয়ে আসে জঙ্গিরা। তালিবান সরকার-কে ভারত কোনওদিন স্বীকৃতিই দেয়নি, তাদের সঙ্গেই কূটনৈতিক সমঝোতা করার চ্যলেঞ্জ তৈরি হয়েছিল ভারতের সামনে। এরমধ্যে নয়াদিল্লি জানতে পেরেছিল, পাঁচ ছিনতাইকারী জঙ্গি হরকত-উল-মুজাহিদিন-এর সদস্য। তাদের দাবি ছিল, পাক সন্ত্রাসবাদী মৌলানা মাসুদ আজহার-সহ ভারতীয় কারাগারে বন্দী আরও ৩৫ জঙ্গিদের মুক্তি দিতে হবে। সেইসঙ্গে ২০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থ মুক্তিপণ দিতে হবে। প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী সন্ত্রাসের সামনে মাথা নোয়াবেন না বলে বিবৃতি দিলেও, যত দিন যাচ্ছিল ততই চাপ বাড়ছিল সরকারের উপর। এই অবস্থায় জঙ্গিদের সঙ্গে সমঝোতা করা ছাড়া দ্বিতীয় পথ খোলা ছিল না সরকারের কাছে।

 

69

এরমধ্যে নয়াদিল্লি জানতে পেরেছিল, পাঁচ ছিনতাইকারী জঙ্গি হরকত-উল-মুজাহিদিন-এর সদস্য। তাদের দাবি ছিল, পাক সন্ত্রাসবাদী মৌলানা মাসুদ আজহার-সহ ভারতীয় কারাগারে বন্দী আরও ৩৫ জঙ্গিদের মুক্তি দিতে হবে। সেইসঙ্গে ২০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থ মুক্তিপণ দিতে হবে। প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী সন্ত্রাসের সামনে মাথা নোয়াবেন না বলে বিবৃতি দিলেও, যত দিন যাচ্ছিল ততই চাপ বাড়ছিল সরকারের উপর। এই অবস্থায় জঙ্গিদের সঙ্গে সমঝোতা করা ছাড়া দ্বিতীয় পথ খোলা ছিল না সরকারের কাছে।

 

79

তৎকালীন গোয়েন্দা (আইবি) প্রধান অজিত ডোভালের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে জঙ্গিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আফগানিস্তানের তালিবান সরকারও মধ্যস্থতা করতে রাজি হয়। আলোচনার পর ছিনতাইকারীরা অর্থের দাবি চেড়ে দেয় এবং জঙ্গি মুক্তির সংখ্যাও ৩৬ থেকে ৩-এ নামিয়ে আনে। ২৮ ডিসেম্বর এই নিয়ে ৪০ মিনিটের উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী সেখানে সাফ জানান, পণবন্দি থাকা নাগরিকদের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। ১৬০ জন যাত্রীর নিরাপত্তার বিনিময়ে ৩ জন সন্ত্রাসবাদীকে মুক্তি দিতে রাজি হয় সরকার। আর সন্ত্রাসবাদীদের নিয়ে গিয়ে পণবন্দীদের মুক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিংকে।

 

89

মুক্তিপ্রাপ্ত এই তিন সন্ত্রাসবাদী নেতা ছিল ওমর শেখ, মৌলানা মাসুদ আজহার ও মোস্তাক আহমেদ জারগার। ওমর শেখ পরে আমেরিকায় ৯/১১ হামলার অর্থ সংগ্রহ করেছিল এবং মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্লকে অপহরণ ও হত্যা করেছিল। মৌলানা মাসুদ আজহার জৈশ-ই-মহম্মদ গঠন করেছিল। এই জঙ্গি গোষ্ঠী ২০০১ সালে সংসদ হামলা, ২০১৬ সালে পাঠানকোটে ভারতীয় বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলা এবং ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলা চালিয়েছে। কাজেই এই জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল, তাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার।

 

99

অনেকেই সেই সময়ে এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি। প্রথমদিকে যশবন্ত সিং নিজেও এতে রাজি ছিলেন না বলে জানা যায়। লালকৃষ্ণ আদবানি প্রধানমন্ত্রীকে দুই পৃষ্ঠার চিঠি লিখে বলেছিলেন, এতে ভারতকে দুর্বল মনে করবে জঙ্গিরা। জর্জ ফার্নান্দেজও আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাও ভবিষ্যতের বিপদ আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছিলেন। তবে পরে, জশবন্ত সিং তাঁর লেখা এক গ্রন্থে বলেছিলেন, জাতীয় সুরক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি সাদা-কালোর হিসাবে নেওয়া যায় না। প্রায়শই খারাপ এবং তার থেকে কম খারাপ সিদ্ধান্তের বেছে নিতে হয়। ৩ জন সন্ত্রাসবাদীর মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে খারাপ, তবে ১৬০ জন নিরীহ নাগরিকের জীবনে ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই খারাপ হত।