৪০ দিনেরও বেশি সময় হয়ে গেল লকডাউন চলছে ভারতে। বন্ধ ট্রেন, বাস সহ যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই। আর তাতে সব থেকে খারাপ হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে আটকে পরা পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থা। সরকার শ্রিমক দিবসের দিন থেকে পরিযায়ী শ্রিমকদের জন্য বিশেষ ট্রেন চালু করলেও অনেকেই সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর সম্বল বলতে নিজের দুই পা। বাড়ি ফেরার জন্য এখন দেশের নানা প্রান্তেই শিশু থেকে মহিলা, জোয়ান থেকে বুড়ো সকলকেই দেখা যাচ্ছে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটতে। 

বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটতে শুরু করেছেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নিকিতাও। পরনে শাড়ি, টেনে পিছনে খোপা বাঁধা, আঁচল দিয়ে ঢাকা পেট, ওই অবস্থাতেই  হনহনিয়ে হাঁটছেন প্রসূতি। প্রখর রোদে পিঠ পুড়ছে, পুলিসের চোখরাঙানিতে জল আসছে চোখে, কিন্তু সবকিছুই উপেক্ষা করে রুদ্ধশ্বাসে হেঁটে চলেছেন বছর বত্রিশের মহিলা।  টানা ১২ ঘণ্টা এভাবেই হেঁটেছেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নিকিতা। উদ্দেশ্য সব বাধা পেরিয়ে পৌঁছতে হবে নিজের গ্রামে।

করোনার সৌজন্যে ফের ঘটে গেল মিরাকল, এবার বিহারের গ্রাম থেকেই দেখা মিলল এভারেস্টের

লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হল ২৯ মে পর্যন্ত, ১৪৪ ধারা জারি থাকবে চলতি মাসের শেষপর্যন্ত

সত্যি 'সেলুকাস' ভারত বড়ই বিচিত্র, অর্ধভুক্ত দেশে ৫২ হাজার টাকার মদ কিনলেন এক ক্রেতা

মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর-গ্রাম থেকে হাইওয়ে ধরে হাঁটা শুরু করেছেন অগুনতি শ্রমিক। পুলিশের ভয় কিংবা মৃত্যুভয়ও তাঁদের দমাতে পারছে না। মুম্বই এবং সংলগ্ন ভিওয়ান্ডি এলাকা থেকে দলে দলে শ্রমিক নিজেদের গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। নভি মুম্বইয়ের কাছে ঘনসোলি থেকে ৪৮০ কিলোমিটার দূরত্বের বুলধানা গ্রামের দিকে রওনা হয়েছে এমনি ২০ জনের একটি দল। সেই দলেরই সদস্য নিকিতা। 

নভি মুম্বইয়ের ঘানশোলি থেকে মহারাষ্ট্রের বুলধানা গ্রাম- কয়েকশো কিলোমিটার পথ। এই পথ পায়ে হেঁটেই  পারি দিতে চান নিকিতা। লকডাউনে কাজের জায়গায় আটকে পড়েছিলেন তিনি। ফিরতে পারছিলেন না, একদিকে খাবার, টাকাপয়সা-সবই ফুরিয়ে আসছে। এতদিন প্রশাসনের ওপর ভরসা রেখেছিলেন , কিন্তু আর ধৈর্য্য রাখতে পারেননি। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নিকিতা তাই ঠিকই করে ফেলেন বুলধানায় গ্রামের বাড়িতে হেঁটেই ফিরবেন তিনি।

অসম্ভব মনের জোরকে সঙ্গে নিয়েই নিকিতা রাস্তায় হাঁটা শুরু করেন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটা থেকে। একটানা হেঁটেছেন প্রায় ১২ ঘণ্টা। মাঝে অবশ্য কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়েছেন।  উৎসুক এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, "কী করব বাবু, আমাদের মতো লোকেদের জন্য তো আর জল খাবারের বেশি ব্যবস্থা নেই। সব শেষ হয়ে গিয়েছে। ফিরতেই হবে এবার।"

নিকিতার সঙ্গে এক যুবক নিজের জমা পুঁজি ও সঞ্চয়ের সবটুকু মাথায় নিয়ে হেঁটে চলেছেন। তাঁর কথায় কথায়, “শহরে থেকে লাভ নেই। খাবার-জল কিছুই নেই ওখানে। আর স্পেশ্যাল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।“ ওই দলের নজরে এসেছেন আর একজন মা। কোলে এক সন্তান, কাঁধে আর একজন। দীর্ঘ পথ এইভাবেই হেঁটে চলেছেন ওই মহিলা। ২০ জনের দলের অনেকেরই অভিযোগ, পুলিশের কাছে অনুমতি চাইতে গেলে বদলে জোটে মার। তাই আর কোনওদিকে না তাকিয়ে এবার রাস্তাতেই নেমে পড়েছেন তাঁরা।

অন্যদিকে মুম্বই থেকে বিহারের দ্বারাভাঙায় নিজেদের গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছে ১৫ জন পরিযায়ী শ্রমিকের দল। সাইকেলে চড়েই পাড়ি দেবেন প্রায় ২০০০ কিলোমিটার। ওই সাইকেলের চারপাশেই কোনওমতে বেঁধে নিয়েছেন নিজেদের সহায়-সম্বল। মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ থেকে ভোর তিনটেয় রওনা হয়েছেন তাঁরা। পথে খাবে বলে সঙ্গে রয়েছে শুকনো বাসি ভাত। দলের অনেকেই বলছেন, “স্পেশ্যাল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই। মুম্বইতে একবার বর্ষা এসে গেলে আর রক্ষে নেই। এখনই খাবার-পানীয় জলে টান পড়েছে। কাজ গিয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে বর্ষায়।“

 

দেশে তৃতীয় দফার লকডাউন শুরু হয়েছে সোমবার থেকে। এই পর্যায়ে বেশ কিছু নিয়ম শিথিল করেছে সরকার। আর তাতেই রেড, অরেঞ্জ ও গ্রিন জোনে খুলেছে মদের দোকান। প্রতিদিনই সেইসব দোকানের সামনে চোখে পড়ছে লম্বা লাইন। কারও বিল উঠছে ৫২ হাজার টাকার, কেউ বা মদ কিনছেন ৯৫ হাজার টাকার। সেই সব বিল এখন ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়াতে। আর অন্যদিকে রয়েছে নিকিতাদের ভারত। যেখানে কাজ হারিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে  হেঁটেই বাড়ি ফিরতে হয় সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে।