এজেন্টের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা  খুইয়ে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ উপায়ে আমেরিকা প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ধরা পড়ে যান মেক্সিকো সীমান্ত রক্ষীদের কাছে। জরুরি ভিত্তিতে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু কেমন ছিল তাঁদের যাত্রা, কেনই বা তাঁরা অবৈধভাবে আমেরিকা প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন? আতঙ্কিত মুখ নিয়ে এই কদিনের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তাঁরা উগড়ে দিলেন সাংবাদিকদের কাছে। কীভাবে দিনের পর দিন জল ছাড়া, খাবার ছাড়া গভীর জঙ্গলে দিন কাটাতে হয়েছে। জল তেষ্টা পেলে ঘামকে ভরসা করেই তাঁদের বেঁচে থাকতে হয়েছে। কীভাবে প্রখর রোদে খোলা আকাশে দিনের পর দিন কেটেছে তাঁদের। 

মেক্সিকো থেকে ফিরে আসা তিন শতাধিকের মধ্যে বেশিরভাগ কৃষি প্রধান পরিবার থেকে এসেছেন। তাঁদেরই একজন ২৬ বছরের সেভক সিং জানিয়েছেন, 'আমি যাওয়ার আগে ইউটিউবে ভিডিও দেখেছি। ভিডিওগুলো দেখে এত ভয়ঙ্কর বলে কিছু মনে হয়নি। আমাদের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। কোনও জল বা খাবার ছিল না। তেষ্টা পেলে ঘামে ভিজে যাওয়া জামা নিংড়ে খেতাম।'

২৩ বছরের দীপ সিং জানিয়েছেন, 'প্রথমে আমরা এজেন্টের সঙ্গে কথা বলি। এজেন্ট আমাদের বলেছিলেন, আমেরিকার ভিসা পাওয়া খুব সহজ বিষয়। আমাদের শুধু একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিতে হবে। আমার অনেক বন্ধু এখন আমেরিকায় কাজ করছে। তাদের আমি এই এজেন্টের কথাও বলেছিলাম। আমরা প্রথমে পঞ্জাব থেকে দিল্লি আসি। দিল্লিতেই আমরা টিকিট হাতে পাই। আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোথাকার বিমানে উঠব কিছু এজেন্ট জানায়নি। আমরাও কিছু জানতে চাইনি। আমরা প্রথমে ইকুয়েডরের বিমানবন্দরে নামি। তারপর কখনও গাড়িতে তো কখনও বিমানে আমরা কলম্বিয়া, ব্রাজিল, পেরু, পানামা, কোস্টারিকা, হনডুরাস, গুয়াতেমালা হয়ে শেষে আমরা মেক্সিকোতে পৌঁছই। প্রতিবার আমাদের অত্যন্ত সস্তা আর খারাপ হোটেলে রাখা হয়েছিল। প্রতিবার পাঁচ-ছয় জন বন্দুকবাজ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকত।'  ২২ বছরের সোনু জানিয়েছে,  টানা পাঁচ -ছয় দিন আমাদের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। সেই সময় আমাদের কাছে কোনও খাবার ছিল না। যে টুকু জল ছিল শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের দলে অনেকে এই সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। 

অমৃতসরের ২৮ বছরের মনজিৎ সিং জানিয়েছেন, একদল মাফিয়া আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নিয়েছিল। যাত্রার ধকল নিতে না পেরে কয়েকজনেরর মৃত্যু হয় বলেও তিনি দাবি করেন। তবে মৃতদের সম্পর্কে বিস্তারিত কোনও তথ্য তিনি দিতে পারেননি বলে জানা গিয়েছে। 

মেক্সিকোর একটা ক্যাম্পে তাঁদের রাখা হয়েছিল, খেতে দেওয়া হতো দিনে মাত্র দুবার। মেক্সিকোর ওই ক্যাম্পে তাঁদের ২৫ থেকে ৩০ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল।  তাঁদের জানানো হয়, একটা কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ওই কাগজ পেলেই সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় যাওয়া সম্ভব হবে। দেশে ফিরে আসতে পেরে খুশি ওই দলের সদস্যরা। এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, টাকা যাক, প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরে আসতে পেরেছি এই ভাগ্যের। ওগুলো মনে না করে নতুন করে শুরু করব। 
 
মাস খানেক আগে আমেরিকার অ্যারিজোনা প্রদেশের এক মরুভূমি থেকে  বছর ছয়েকের পঞ্জাবি শিশুকে উদ্ধার করা করে মার্কিন নিরাপত্তারক্ষীরা। এরপরেই উঠে আসে এক মর্মান্তিক কাহিনী। জানা যায়, পঞ্জাব প্রদেশ থেকে মায়ের সঙ্গে শিশুটি মেক্সিকো হয়ে আমেরিকা প্রবেশের চেষ্টা করেছিলন। কিন্তু মেক্সিকোতে আসার পর হঠাৎ করে এজেন্ট তাঁদের ছেড়ে পালিয়ে যান। সেই সময় তাঁদের কাছে জল পর্যন্ত ছিল না। অন্য একটি ভারতীয় পরিবারের কাছে শিশুটিকে রেখে মা জলের সন্ধানে বের হন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন তাঁর শিশু নেই। কয়েকদিন পর ওই শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করে মার্কিন নিরাপত্তা কর্মী।