মে মাসের শুরু থেকে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চিন সেনার বিরোধ চলছেসম্প্রতি বিরোধ মেটাতে শুরু হয়েছিল আলোচনাসোমবার রাতে তারমধ্য়েই উত্তেজনা বেড়ে গিয়েছে বহুগুণেঠিক কি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধে জড়াচ্ছে চিন

মে মাসের শুরু থেকে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চিন দুই দেশের সেনার মধ্যে বিরোধ চলছে। সম্প্রতি বিরোধ মেটাতে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা শুরু হলেও, সোমবার রাতে গ্যালওয়াল উপত্যকায় হিংসাত্মক সংঘর্ষে এই বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখনও অবস্থা হাতের বাইরে বেরিয়ে না গেলেও উত্তেজনা উঠেছে চরমে। কিন্তু, ঠিক কি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধে জড়াচ্ছে চিন?

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

বর্তমানে গ্যালওয়াল উপত্য়কা-সহ আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় দখল নিয়ে ভারত ও চিন সেনার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলেও মূল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে, ছবির মতো নীল জলের একটি হ্রদ, যার নাম প্যাংগং তসো। বলিউটি চলচিত্র 'থ্রি ইডিয়টস'-এর শেষ দৃশ্যে যে হ্রদটিকে দেখানো হয়েছিল, সেটিই হল এই প্যাংগং হ্রদ।

১৪,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদটির নামের আক্ষরিক অর্থ 'কনক্লেভ হ্রদ' অর্থাৎ গোপন বৈঠকের হ্রদ। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর ১৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হ্রদের প্রায় ৪৫ কিলোমিটার ভারত নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি অংশ রয়েছে চিনের দখলে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা গিয়েছে এই হ্রদের মাঝখান দিয়েই। ইংরাজী, হিন্দি এবং ম্যান্ডারিন - তিন লিপিতেই দুই দেশ তাদের অঞ্চল চিহ্নিত করে রেখেছে। এই হ্রদের পাশ দিয়েই রয়েছে চ্যাং চেনমো নামে পরিচিত কারাকরাম পর্বতমালার পূর্বদিকের বর্ধিত আটটি অংশ। হাতের আঙুলের মতো দেখতে এই এই পার্বত্য শাখাগুলিকে আঙুল বলা হয়। এই আট আঙুলের দখল নিয়েই মূল বিতর্ক।

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে ১৯৬২ সাল থেকেই ভারত ও চিনের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। ভারতের দাবি এই নিয়ন্ত্রণ রেখা গিয়েছে ৮ নম্বর আঙুল দিয়ে। ভারতীয় সেনা পায়ে হেঁটে ৮ নম্বর আঙুল পর্যন্ত টহল দেয় বটে কিন্তু ৪ নম্বর আঙুলের পরে ভারতীয় বাহিনীর সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ কোনওদিনই ছিল না। অন্যদিকে চিনের দাবি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা গিয়েছে ৪ নম্বর আঙুল দিয়ে। তবে কখনও কখনও তারা হালকা যানবাহনে ২ নম্বর আঙুল পর্যন্তও টহল দেয়। মে মাসে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়েছিল ৫ নম্বর আঙুলের কাছে। বর্তমানে ঝামেলা চলছে ২ নম্বর আঙুলের কাছে।

বরাবরই চিন ৪ নম্বর আঙুল পর্যন্ত এলাকা দাবি করেছে। ২০১৪-১৫ সালে ভারতের তীব্র আপত্তিতে ৪ নম্বর আঙুলের কাছে তাদের তৈরি একটি স্থায়ী কাঠামো ভেঙে দিয়েছিল চিন। তাতে মনে রা হয়েছিল চিনা কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর জোর দিচ্ছে। তবে ২০১৭ সালে ডোকলাম স্ট্যান্ডঅফের সময়-ও চিন সেনা এই পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিল। তার আগে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে কার্গিল যুদ্ধের সময়, প্যাংগং তসো এলাকা থেকে ভারত সেনা সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল 'অপারেশন বিজয়'এ নিযুক্ত করতে। সেই ফাঁকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার টপকে ভারতীয় অংশে চিন, প্যাংগং হ্রদের পাশে প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা রাস্তা তৈরি করেছিল। সাম্প্রতিক আগ্রাসন তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই অংশ।

বস্তুত পানগং হ্রদ সামরিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকে চুসুল উপত্যকার খুবই কাছে। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের সময় এই চুসুল উপত্যকা ছিল অন্যতম যুদ্ধক্ষেত্র। ৪ নম্বর আঙুল পর্যন্ত উপস্থিতি থাকলে চুসুল উপত্যকার উপর নজর রাখার ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। এই কারণে বরাবরই চিন ভারতকে এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধা দিয়েছে। প্যানগং তসো হ্রদের পুরোটা দখলে রাখতে পারলে, সামরিক কৌশলগত সুবিধা পাবে চিন। এই কারণেই ভারতের সঙ্গে তুমুল দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে চিন।

সেই সঙ্গে প্যাংগং তসো এবং গালওয়ান অঞ্চলে চিনা আগ্রাসনের আরও একটি কারণ রয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে ভারত কোনও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করুক তা একেবারেই চায় না বেজিং। তাদের আশঙ্কা সেই ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়বে তাদের আকসাই চিন এবং লাসা-কাশগড় হাইওয়ের দখলদারি। এতে করে পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত লাদাখ ও জম্মু ও কাশ্মীরের অংশগুলিতে চিনের যে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা রয়েছে তাও ধাক্কা খাবে।

ভারত এই মুহূর্তে দৌলত বেগ ওল্ডি থেকে দরবুক হয়ে শায়োক পর্যন্ত ২৫৫ কিলোমিটার লম্বা একটি রাস্তা তৈরি করছে। রাস্তাটি হয়ে গেলে কারাকোরাম পাসে ভারতী সেনার শেষ ঘাঁটির সঙ্গে দৌলত বেগ ওল্ডি বায়ুসেনা ঘাঁটির যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে যাবে। লেহ থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি দূব়ত্ব দুই দিন থেকে নেমে আসবে ছয় ঘন্টায়। এই রাস্তা নির্মাণই আরও ভয় পাইয়ে দিয়েছে চিনকে। যার থেকেই বর্তমান উত্তেজনার সৃষ্টি বলে মনে করা হচ্ছে।