১৯৭৫ সালের ২৫ জুন, ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে কালো অধ্যায়। এদিনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছিলেন ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ। এক লহমায় খর্ব করা হয়েছিল দেশবাসীর বাক স্বাধীনতা। কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বিরোধ প্রদর্শনের ক্ষমতাও। রাতারাতি  গ্রেফতার করা হয়েছিল দেশের প্রথম সারির বিরোধী নেতাদের। ইতিহাসবীদদের কথায় ভারতীয় ইতিহাসে এটি একটি বিতর্কিত অধ্যায়ও বটে। দীর্ঘ ২১ মাস ধরেই জারি থাকে এই জরুরি অবস্থা। 

কিন্তু কেন জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীকে? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছি। এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে ১৯৭১সালের লোকসভা নির্বাচনের। রায়বরেলি ছিল ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী ক্ষেত্র। প্রতিপক্ষ রাজনারায়ণ তাঁর কাছে হেরে যান। কিন্তু তারপরই ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দূর্নীতির অভিযোগ তুলে এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলাতেই দোষী সাব্যস্ত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ৬ বছরের জন্য তাঁকে সংসদীয় রাজনীতি থেকে বহিষ্কার করেন।  তারপর সেই মামলা যায় সুপ্রিম কোর্টে। 

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা আইয়ার বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন ইন্দিরা। কিন্তু ভোট দিকে পারবেন না। পাশাপাশি জানান হয় তিনি কোনও বেতনও নিতে পারবেন না। এই রায়ের পরই রাতারাতি ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রপতির মারফত জরুরি অবস্থা জারি করেন। সেই দিনটাই ছিল ২৫ জুন ১৯৭৫। তবে বলা হয়েছিল নিরাপত্তার কারণেই জরুরি আবস্থা জারি করা হয়েছে। পরের দিন সকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে জরুরি অবস্থার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তার আগের রাত থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তার প্রস্তুতি। বিরোধী নেতাদের 'শাস্তির' ব্লু প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল রাতের অন্ধকারেই। অনেক ক্ষেত্রে রাতের অন্ধকারেই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। 

 ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে জোট বাঁধছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির প্রথম সারির নেতারা। বেশ কিছু বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছিল। যেদিন জরুরি অবস্থা জারি করা হয় সেই রাতেই বৈঠক করেছিলেন জেপি গয়াল, রাজ নারায়ণ। বৈঠকের স্থান ছিল দিল্লিতে মোরার্জি দেশাইয়ের বাড়ি। সেদিনের সেই বৈঠকে ছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানীও। 


সেই সন্ধ্যেবেলাই বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা যখন তাঁদের আগামী রণকৌশল স্থির করছেন তখন ইন্দিরা গান্ধী সম্পূর্ণ অন্য ছবি আঁকছেন। যা তাঁরা ভ্রূনাক্ষরেও টের পাননি। এলাহাবাদ হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সামনে রেখেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি পরবর্তী কর্মসূচি স্থির করার দিকে এগিয়ে ছিল। তাঁদের দাবি ছিল ইন্দিরা যদি সম্মানজনক অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অফিস না বার হন তাহলে কোঅর্ডিনেশন কমিটি অহিংস পদ্ধতিতে সত্যাগ্রহের পথে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনেই হবে বিক্ষোভ। প্রথম দিনে ইন্দিরা বিরোধী জোটে ছিল কংগ্রেস (ও), ভারতীয় লোকদল, জন সংঘ (তখনও তৈরি হয়নি বিজেপি), সোশ্যালিস্ট পার্টি, আকালি দল। পরবর্তী কালে দেশের আরও অনেক রাজনৈতির দল ইন্দিরা বিরোধী জোটে সামিল হয়েছিল। 

এই বৈঠকের পর রাজ নারায়ণকে নিয়ে গয়াল তাঁর তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।  নিরাপত্তার কারণে তাঁরা গাড়ি করেই ফেরেন। রাজ নারায়ণকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গয়াল চলে যান।  কিন্তু ভোর তিনটের সময় ঘুম ভাঙে উর্মিলেশ ঝার ডাকে ঘুম ভাঙে তাঁদের। উর্মিলেশ ছিলেন রামমনোহর লোহিয়ার সেক্রেটারি। রাজ নারায়ণের সেক্রেটারি হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। তিনি তাঁদের দুঃসংবাদ দেন। জানান মিশা  আইন প্রয়োগ করা হয়েছে রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে। কিন্তু গ্রেফতারির পরেও সম্পূর্ণ শান্ত ছিলেন রাজনারায়ণ। তিনি স্নান সেরে প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই নিয়েই বাড়ি ছাড়েন। তারপরই পুলিশ গ্রেফতার করে এই রাজনীতিবিদকে।  জয়প্রকাশ নারায়ণ, আলকৃষ্ণ আডবানীর সঙ্গে তাঁকেও জেলে পোরায় হয়েছিল।