তাপস দাসঃ মেয়েরা যে এ দেশে পিছিয়ে পড়া, এ এক রূঢ় ও অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য। এই বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে যেমন লাভ নেই, তেমনই রাতারাতি এ পরিস্থিতি পাল্টে যাবে, এমন কোনও জাদুও নেই। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কেন্দ্রীয় সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্যোগী। কন্যাসন্তানদের কথা মাথায় রেখে চালু পাঁচটি প্রকল্পের কথা এখানে আলোচিত হল। 

১. বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও- 
সারা দেশের কন্যাসন্তানদের কথা মাথায় রেখে এই প্রকল্প। ২০১৫ সালের২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্প ঘোষণা করেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ভারতে নারী পুরুষের অনুপাতের হিসেবে নারীর সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। ২০১৪ সালে সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কন্যাভ্রূণহত্যার বিপদ সম্পর্কে উল্লেখ করেন, এবং কীভাবে এ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সে নিয়ে জনমত আহ্বান করেন। বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য কন্যাভ্রূণ হত্যা বন্ধ করা এবং মেয়েদের শিক্ষা সুনিশ্চিত করা। দেশের যেসব জেলায় নারীর জনসংখ্যার অনুপাত পুরুষের থেকে কম, প্রাথমিকভাবে সেখানে এই প্রকল্পে জোর দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরুতেই ঘোষিত। এই প্রকল্পে নগদ টাকা দেবার প্রয়োজন হয় না। এই প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য হল, 

ক) লিঙ্গজনিত কারণে ভ্রূণহত্যা রোধ।
খ) মশৈশবে কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ও লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা।
গ) কন্যাসন্তানের স্কুল যাওয়া সুনিশ্চিত করা।
ঘ) মেয়েদের সুচারু ও নিরাপদ জীবনের সুনিশ্চয়তা।
ঙ) মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারে সমর্থন।

২. সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা- 
এই যোজনা বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও প্রকল্পেরই অংশ। ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্প ঘোষণা করেন। এই প্রকল্পে কোনও কন্যাসন্তান তার বাবা-মা বা আইনি অভিভাবকের সঙ্গে ব্যাঙ্কে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে, যে অ্যাকাউন্টে প্রথম নাম ওই কন্যাসন্তানের হতে হবে। কন্যাসন্তানের বয়স ১০ বছর হবার আগে এই অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় এবং অ্যাকাউন্ট খোলা দিন থেকে ১৫ বছর, বা কন্যার বিবাহ পর্যন্ত ওই চালু রাখতে হয়। প্রকল্প অবশ্য সম্পূর্ণতা পায় অ্যাকাউন্ট খোলার তারিখ থেকে ২১ তম বছরে। এই যোজনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি হল,

ক) ন্যূনতম ২৫০ টাকা থেকে ঊর্ধ্বতম দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত রাখা যায় ওই অ্যাকাউন্টে। 
খ) সুদের হার শুরুতে ৯.১ শতাংশ ও ৯.২ শতাংশ হলেও বর্তমানে সুদের হার ৭.৬ শতাংশ।
গ) পোস্ট অফিস বা ব্যাঙ্কে এই অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব।
ঘ) আয়কর আইনের ৮০সি ধারায় এই অ্যাকাউন্ট থেকে দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত করছাড় পাওয়া যায়।
ঙ) কন্যাসন্তানের বয়স ১৮ হলে উচ্চশিক্ষার জন্য আংশিক অর্থ অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা যায়।

৩. বালিকা সমৃদ্ধি যোজনা- 
দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থিত শিশুকন্যা ও তার পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য এই স্কলারশিপ প্রকল্প। কন্যাসন্তান ও তার জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি পরিবার ও গোষ্ঠীসমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যাতে দূর করা যায়, তা এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। এরই সঙ্গে উদ্দেশ্য হিসেবে রয়েছে বাল্যবিবাহ রোধ এবং মেয়েদের স্কুলে ভর্তি ও তার স্কুলে যাওয়া নিয়মতকরণ। এই প্রকল্প গ্রাম ও শহর দুই ক্ষেত্রেই চালু। কন্যাসন্তানের জন্মের পরই কন্যার মাকে ৫০০ টাকা নগদ সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে এই প্রকল্পে। স্কুলে পড়াশোনার সময়ে যে হিসেবে অর্থ দেওয়া হয়ে থাকে তা এইরকম,

ক) প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বছরে ৩০০ টাকা করে, চতুর্থ শ্রেণিতে বছরে ৫০০ টাকা।
খ) পঞ্চম শ্রেণিতে বছরে ৬০০ টাকা, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে বছরে ৭০০ টাকা করে।
গ) অষ্টম শ্রেণিতে ৮০০ টাকা, দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ১০০০ টাকা প্রতি বছরে।
ঘ) কন্যার বয়স ১৮ হলে প্রকল্পের পুরো অর্থ তুলে নেওয়া যেতে পারে।  

৪. সিবিএসই উড়ান প্রকল্প-
ভারত সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের মাধ্যমে এই প্রকল্পের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য দেশের প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরি শিক্ষার কলেজে মেয়েদের ভর্তি বাড়ানো। এই প্রকল্পের আরও একটি উদ্দেশ্য হল সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের মেয়েদের শিক্ষার অভিজ্ঞতায় জোর। প্রতি বছর সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির অন্তর্গত ১০০০ ছাত্রীকে এই সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে। বাছাই ছাত্রীদের শুরুতেই একটি ট্যাব প্রদান করা হয়, যাতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় কনটেন্ট লোড করা থাকে। 

ক) এই প্রকল্পের জন্য সিবিএসই প্রতি রাজ্যে শিক্ষক ও প্রিন্সিপাল নিয়োগ করে।  
খ) এই প্রকল্পে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির মেয়েদের বিনামূল্যে কোর্স কনটেন্ট, অনলাইন পরিষেবা দেওয়া হয় যার মধ্যে থাকে ভিডিও কনটেন্টও।
গ) মেধাসম্পন্ন মেয়েদের বেছে নিয়ে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ঘ) পড়াশোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যও রয়েছে হেল্পলাইন।  
ঙ) ছাত্রীদের পড়াশোনা ও তাদের অগ্রগতিও নথিভুক্ত করা হয় এই প্রকল্পে।

৫. মেয়েদের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের ইনসেনটিভ প্রকল্প- 
ভারতব্যাপী এই প্রকল্প পরিচালনা করে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগ। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য দেশের অনগ্রসর শ্রেণির মেয়েরা। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েরা, বিশেষ করে যারা ক্লাস এইট পাশ করেছে, তারা যাতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ করে, সে লক্ষ্যে এই প্রকল্প। এই প্রকল্পে আওতাধীন মেয়েরা তাদের নামে ৩০০০ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট পায়। ক্লাস টেনের পরীক্ষা শেষ করলে এবং ১৮ বছর বয়স হলে এই ফিক্সড ডিপোজিটের অর্থ তোলা যেতে পারে। তার আগে আংশিক পরিমাণ অর্থও তোলা যাবে না এই প্রকল্প থেকে।

ক) ক্লাস এইট পাশ করা সমস্ত তফশিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত মেয়েরা এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারে। 
খ) অন্য সামাজিক গোষ্ঠীভুক্তরা, যদি তারা কস্তুরবা গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণি পাশ করে, তাহলে তারাও এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারে। তবে তাদের সরকারি বা সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি বাধ্যতামূলক। 
গ) প্রকল্পের সুবিধা পাবার জন্য নবম শ্রেণিতে ভর্তির সময়ে বয়স অবশ্যই ১৬ বছরের নিচে হতে হবে। 
ঘ) বিবাহিতা মেয়েরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবে না।
ঙ) সুবিধা পাবে না বেসরকারি বা কেন্দ্রীয় সরকারি স্কুলে পড়ছে এমন মেয়েরাও।