মঙ্গলবার জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ঐশী ঘোষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। কানহাইয়া কুমারের আজাদির স্লোগানের সময়ে তাঁর পাশেই দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এর কয়েকঘণ্টার মধ্যে সোশাল মিডিয়ায় শুরু হয়ে যায় 'আক্রমণ'। গেরুয়া শিবিরের লোকজন কোনওরকম রাখঢাক না-করেই দীপিকার ছবি বয়কটের ডাক দেন। যার প্রতিবাদে সোশাল মিডিয়ায় কার্যত সোচ্চার হয়েছেন নেটিজেনরা। এমনকি কট্টর মোদিভক্তরাও!

বুধবার থেকে দিল্লিতেই রয়েছেন দীপিকা। অ্যাসিড আক্রান্ত তরুণীর ভূমিকায় তাঁর অভিনীতি নতুন ছবির প্রচারে সেখানে গিয়েছেন দীপিকা। ওইদিন সন্ধেয় জেএনইউয়ের ক্যাম্পাসে সাবরমতী হোস্টেলের বাইরে টি-পয়েন্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ও শিক্ষক সংগঠনের প্রতিবাদসভা ছিল। সেখানে ছিলেন ছাত্র সংসদের আহত নেত্রী ঐশী ঘোষ ও অন্যান্য প্রতিবাদী পড়ুয়ারা। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের অন্যতম মুখ কানহাইয়া কুমারও। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ জেএনইউয়ের ক্যাম্পাসে গিয়ে ঐশীকে নমস্কার জানান দীপিকা। যে ছবি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। পরে ঐশীর ফেসবুক পেজে সেই ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, 'প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলুন'। বুধবার রাতেই একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দীপিকা স্পষ্ট বলেছেন, "মানুষ যে নির্ভয়ে বেরিয়ে এসে নিজের মত প্রকাশ করছেন, সেটা খুবই ইতিবাচক।"

ব্যস। এরপরই ক্ষেপে ওঠে গেরুয়া শিবির। প্রথমে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক মন্তব্য, পরে সোজাসুজি দীপিকার ছবি বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। কার্যত দীপিকাকেই বয়কটের ডাক দেন গেরুয়াপন্থীরা। যদিও এই বয়কটের ডাককে ভালভাবে নেন না নেটিজেনরা। সোশাল মিডিয়ায়  শুরু হয়ে যায় তুমুল বিতর্ক। এতদিন এনআরসি-সিএএ-র পক্ষে যাঁরা প্রবল সমর্থন করেছেন বিজেপিকে, তাঁরাও দীপিকা-ইস্যুতে অন্তত আর গেরুয়াপন্থী থাকতে রাজি হননি।

ফেসবুক ওয়ালে কেউ লিখছেন: দাদাসাহেব ফালকে নিয়ে একজন ব্যস্ত। খানেরা ভাবছে বড় বড় দেশের ছোট ছোট ঘটনা এগুলো। তখন একজন মহিলা অভিনেত্রী হিসেবে এগিয়ে এলেন রিয়েল হিরো। কেউ কেউ বলবে সিনেমা চালানোর জন্য। কিন্তু বাকিদের সিনেমা চালানোর দরকার নেই? 

খোদ মোদি সমর্থক এক নেটিজেন লিখছেন:

বিজেপি সমর্থক এবং নেতাদের প্রতি--

দীপিকা পাড়ুকোন জেএনইউতে গিয়ে ঐশী ঘোষের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে তাঁর সিনেমা বয়কট করতে হবে, এই বালখিল্যতা থেকে কি বেরিয়ে আসা যায় না?

দীপিকা পাড়ুকোন একজন অভিনেত্রী এবং হতেও পারে তাঁর কোনও রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে। তিনি জেএইউতে গিয়েছেন বলে আপনার শত্রু হয়ে যেতে পারেন না।

মনে রাখবেন, আপনার সরকারের দুই মন্ত্রী, গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনও জেএনইউ-এর হিংসার নিন্দা করেছেন। এই দুজনই জেএনইউ-র প্রাক্তনী এবং পেশাদার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ।

জেএনইউ-এর অন্যদিকে চোখ ফেরানো যাক। ঝাড়খণ্ডে বিজেপি হেরে গিয়েছে এবং দিল্লিতেও ওপিনিয়ন পোলের ইঙ্গিত অনুযায়ী আপনারা হারতে চলেছেন। কেন? যে দুই রাজ্যে মাত্র কয়েকমাস আগে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি বিপুল ভোট পেল, সেখানে রাজ্য নির্বাচনে ভরাডুবি হচ্ছে কেন?

দিল্লিতে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৭টি আসন পেয়েছিল, ঝাড়খণ্ডে ১২টি... সেখানে এমন উলটপুরাণ কেন?

তার মানে সরল সত্যটা হচ্ছে, দেশের মানুষ নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দেয়, এখনও বিজেপিকে নয়... এটা যতটা রাহুল গান্ধি টের পাচ্ছেন, ততটাই বিজেপির কর্মী সমর্থকদেরও বুঝতে হবে... আর আপনাদের দলে  কেউ চাণক্য নেই, এখনও পর্যন্ত বিজেপি ভোটে জেতে শুধুই নরেন্দ্র মোদির ক্যারিশমায়।

তাই নরেন্দ্র মোদি নয়, অন্য ফ্যাকটরে বিজেপি জেতে বলে আপনাদের যে সব রাজ্যসভার সাংসদ বা টিকিট প্রত্যাশীরা প্রবন্ধ লেখেন, তাঁরা আসলে ভাবের ঘরে চুরি করছেন... অথবা বিজেপিকে ডোবাতে চাইছেন।

নরেন্দ্র মোদি যখন বলে দিয়েছেন যে কোনও ভারতীয় মুসলিমের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও সংকট নেই এবং এনআরসি নিয়ে তাঁর সরকার ভাবছে না, তখন সেই রাজনৈতিক লাইনকে অনুসরণ করুন... দিনরাত এনআরসি হবেই এবং মুসলমানদের তাড়িয়ে ছাড়ব, এইসব বলে কোনও লাভ নেই। ভারতবর্ষে ২০ কোটি মুসলমান থাকেন, তাঁদের তাড়িয়ে শুধু হিন্দুরা দেশে থাকবেন, এমন অলীক স্বপ্ন নিজেও দেখবেন না, অন্যদেরও দেখাবেন না। একটা ছোট্ট তথ্য মাথায় রাখা জরুরি, ভারতবর্ষকে তার প্রয়োজনের ৮২ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর বেশিটাই আসে মুসলিম বিশ্ব থেকে...অতএব আপনার মুসলিম বিদ্বেষ কোনও কাজের কথা হতে পারে না। নরেন্দ্র মোদি যে ভারতের কথা বলতে চাইছেন, বুঝুন। তিনি জানেন কোথায় হিন্দুত্বের রাশ টানতে হয়। এবং আমি নিশ্চিত, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো দীপিকা পাড়ুকোনের সঙ্গেও নরেন্দ্র মোদি চা খাবেন, কথা বলবেন।