সাধারণত দুটি দেশের মধ্যে বড় কোনও সংঘাত বাঁধলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়। যার থেকে কে কার পাশে দাঁড়িয়ে, তা অনেকটাই পরিস্কার হয়ে যায়। কিন্তু লাদাখ সীমান্তে ভারত-চীন যে লাগাতার সংঘাত, যেখান থেকে যুদ্ধ লেগে যাওয়ার সম্ভবনা প্রচুর, তারপরও কিন্তু সেই চেনা ছকের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। চীন ও ভারতের পাশে দাঁড়ানোর কথাও কেউ খোলাখুলিভাবে জানায়নি।
একমাত্র আমেরিকা, রাশিয়া, জার্মানি, জাপানের মতো কয়েকটা দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এরমধ্যে জার্মানি এবং জাপান প্রায় একই সুরে দুই দেশকে উত্তেজনা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণরেখায় শান্তি ফেরানোর কথা বলেছে এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে বলেছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছেন, দু’দেশেরি বড় ধরনের সমস্যা আছে। তারপর ট্রাম্প যথারীতি মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ভালো করেই জানেন, ভারত কখনই মধ্যস্থতার প্রস্তাব মানবে না। চীনও নয়। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনি মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন। তখনও কেউ মানেনি। লক্ষণীয়; ভারত বা চীন কারও পক্ষ নিয়ে কেউই কিছু বলেননি। 
প্রসঙ্গত, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পিও বলেছেন, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ভারতের সঙ্গে সীমান্তে টেনশন বাড়িয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে  চীন বেআইনিভাবে প্রচুর ভূখণ্ড দাবি করছে এবং সেখানে সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় চীন অস্থিরতা তৈরি করছে। দেখা যাচ্ছে পম্পিও কিছুটা চীনকে দায়ী করছেন। তবে তাঁর উদ্বেগ যতটা দক্ষিণ চীন সমুদ্রের পরিস্থিতি নিয়ে, ততটা ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়ে নয়।  


লক্ষ্যণীয় ট্র্যাম্প কয়েকদিন তাঁর সবভাবসুলভ ভঙ্গিমায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কোনো মন্তব্য পাওয়া জায় নি। বরং রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীন-ভারতের মধ্যে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে। একটি বৈঠকও করেছে দুই দেশ নিয়ে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কিন্তু বাকিরা সেটাও করেনি। ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনসহ বেশিরভাগ দেশ একেবারেই চুপ ভারত-চীন ইস্যুতে।
ইউরোপ-আমেরিকার কথা যদি ছেড়েও দেওয়া যায় তা হলেও এসে পড়ে প্রতিবেশী দেশের কথা। এখন পর্যন্ত ভারতের কোনো প্রতিবেশী দেশ এই সংঘাত নিয়ে একটা কথাও বলেনি। বোঝা জায় তারা এই বিষয়ের মধ্যেই ঢুকতে চায়নি। তার মানে কি অধিকাংশ প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা মধুর নয়? পাকিস্তান ও চীনের কথা বাদই দেওয়া গেল, সম্প্রতি নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই তিক্ত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের সঙ্গেও যে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ এমনটা বলা যাবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক আছে। কিন্তু বাংলাদেশেরও ক্ষোভ আছে তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়ে। ফলে প্রতিবেশীরা যে চীনের বিরোধীতা করবে আর ভারতকে সমর্থন করবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।অন্যদিকে চীনেরও সঙ্গে জাপান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলির সম্পর্ক ভাল নয়। 
অর্থাৎ চীন-ভারত সংঘর্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় তেমন কোনো হেলদোল নেই। খুব অদ্ভুতভাবেই একেবারেই চুপ আসিয়ান, সার্ক, বিমসটেক, ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশনসহ আঞ্চলিক জোটগুলিও। অথচ ভারত ও চীন এই সব আঞ্চলিক জোটগুলির সদস্য।  


আসলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এখন আমূল বদলে গেছে। এখন বিভিন্ন দেশের সম্পর্কে অর্থনৈতিক বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে সামরিক উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার ফুরসত নেই কারোই। লাদাখে ভারত-চীন দু’পক্ষই সৈন্য সমাবেশ ঘটানোয় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে ভঙ্গুর অর্থনীতির পাকিস্তান, চিন-কে সমর্থন জানিয়েছে। এখন যদি আমেরিকা তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতের পাশে দাঁড়ায়, তা হলে অবধারিত ভাবেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এমনটাও অনেকে মনে করেন। 
অন্যদিকে এটাও ঘটনা; ভারত-চীন সংঘর্ষতে বড় দেশগুলির মন্তব্য পালটা মন্তব্য থেকে একটা যুদ্ধং দেহী মনোভাব যে প্রকাশ পায়  তা বিশ্বের শক্তিধর অনেক দেশই বুঝতে পেরেছে। হয়ত তাই  কেউ-ই প্রকাশ্যে চিন-এর আগ্রাসন নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করছে না। ভারত সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে যুদ্ধ বিমানসহ এত সমরাস্ত্র কিনলো, অথচ রাশিয়ার মুখ একেবারে বন্ধ। গলওয়ান সংঘাতের পর চীন ও ভারতকে  নিয়ে একটি বৈঠকের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায় রাশিয়া। কারণ, চীন বা ভারত কেউ-ই তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ মেনে নিতে রাজি হয়নি। ফলে রাশিয়া হয়তো বুঝে গেছে যে, তাদের সেই আগের অর্থাৎ সোভিয়েত আমলের প্রভাব-প্রতিপত্তি এখন আর নেই।

"