তপন মল্লিক, প্রতিবেদক- একবার দু’বার নয় কৃষকদের বোঝাতে কেন্দ্রের সঙ্গে দু’তরফে আটবার বৈঠক হয়েছে কিন্তু কোনও বৈঠকেই চিড়ে ভেজেনি। প্রতিটি বৈঠকের আগে আশোর আলো জ্বলে উঠছে কিন্তু সেই আলো বৈঠক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিভে গিয়েছে। অষ্টম দফার বৈঠকও কেন্দ্রের তরফে কৃষক প্রতিনিধিদের কৃষি আইনের সুবিধা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু আন্দোলনরত কৃষকরা নিজেদের অবস্থানে অনড়। অন্যদিকে কেন্দ্র কৃষি আইন প্রত্যাহার করবে না। ফলে আরও আটবার বৈঠকে বসেও কোনও সমাধান সূত্র মেলা সম্ভব নয়। যেখানে দু’পক্ষই তাদের সিদ্ধান্তে অনড় সেখানে শত আলোচনাতেও কোনও ফল মেলে না-একথা জলের মতো স্পষ্ট।  


কেন্দ্রের তিনটি নতুন কৃষি আইন প্রত্যহারের দাবিতে কৃষকরা আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজধানীর জাতীয় সড়কগুলি অবরোধ করে রাখে। তাঁরা একথাও জানিয়েছিল যে ৬ মাসের প্রস্তুতি নিয়েই তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। সপ্তমবার কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠকের আগেই কৃষকরা ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁরা ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন তাদের তরফে রয়েছে বিশেষ আয়োজন। সেদিন তাঁরা সাধারণতন্ত্র দিবসের ব্যারিকেড ভেঙে দিল্লিতে প্রবেশ করবেন। তার আগে ২৩ জানুয়ারি আজাদ হিন্দ কিষাণ দিবস, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্মরণে সমস্ত রাজ্যে রাজ্যপালের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখাবেন কৃষকরা। 


এর আগে ২০১৫ সালে মোদি সরকার কৃষকদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছিল। তখন জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিলে পরিবর্তন এনেছিল কেন্দ্র। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়ের পর জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার এবং নাগরিকত্ব আইনন নিয়েও মোদি সরকার দেশ জুড়ে বিক্ষোভ আন্দোলন দেখেছে। কিন্তু গত ৬ বছরের তারা এমন বিক্ষোভ কখনো দেখেনি, এ দেশও বিগত কয়েক বছরের মধ্যে দেখেনি। বোঝাই যাচ্ছে যত সময় এগোচ্ছে, মোদি সরকার আরও বড় আন্দোলনের মুখোমুখি পড়তে চলেছে।


এদিকে দেশের শীর্ষ আদালত কেন্দ্রের উদ্দেশে কৃষি আইন কার্যকর করার বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখার কথা বলেছেন। কেবল তাই নয়, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকারকে ভর্ৎসনা করে আদালত একথাও বলেছেন, ‘নতুবা আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা কোনো মর্যাদা রক্ষার বিষয় নয়’। কেন্দ্রকে শীর্ষ আদালতের তরফে কৃষি আইন স্থগিত রাখার নির্দেশে কার্যত ব্যাকফুটে চলে গেল কেন্দ্র। সেই সঙ্গে শীর্ষ আদালত প্রতিবাদী কৃষকদের জন্যে হেভিওয়েট আইনজীবীদের কমিটি গঠন করে দেওয়ায় এবং প্রধান বিচারপতি কৃষি আইন নিয়ে যা চলছে, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করায় আরও একবার প্রবল চাপে পরে গেল কেন্দ্র। 


অন্যদিকে স্বাধীনতা উত্তর এতগুলি বছর পরেও এ দেশের কৃষকদের অবস্থা খারাপ বললেও কিছু বলা হয় না। অথচ দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশ কৃষক। কিন্তু তাঁদের হয়ে কোনও কণ্ঠেই কোনও আওয়াজ নেই, তাঁদের হয়ে কোনও প্রতিবাদ নেই। একথা বললেই  আবার কমিউনিস্টরা মরচে ধরা তোরঙ্গ খুলে তেভাগা, তেলেঙ্গানা বা খাদ্য আন্দোলনের সিলিউট ছবি বের করে আনেন। সেই কবেকার ছবি, আর এতটাই আবছা যেঙ্কিছুই ভাল করে দেখা যায় না। আমাদের দেশে যেখানেই যখন কোনও আন্দোলন ঘটেছে তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন মধ্যবিত্তরা। সে আন্দোলন কৃষক হোক আর শ্রমিক, ইট ভাঁটির কর্মী হোক অথবা মহিলা শ্রমিক, আন্দোলনের নেতৃত্বে মধ্যবিত্ত। তারা বলে দেবেন আর সেই কথা অনুসরন করবেন আন্দোলনকারীরা। কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে কেউ নেতৃত্ব দেবেন তা চিন্তাই করা যায় না।   


এতগুলি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও, এতগুলি কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার পরও তাদের মধ্যে থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার একজন কাউকে পাওয়া গেল না। কেন? তার মানে কি তাঁরা বিপ্লব সম্পর্কে, গণতন্ত্র সম্পর্কে, দেশের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি সম্পর্কে শিক্ষিত ছিল না বলে, নাকি তারা কেউই মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত ছিল না বলে? তার মানে কৃষকরা জমি চাষ করবেন, শ্রমিকরা কারখানায় ঘাম ঝড়াবেন আর মধ্যবিত্ত নেতারা যখন আন্দোলনের ডাক দেবেন তখন তারা সামিল হবেন। কিন্তু দিল্লিতে কৃষকদের দাবি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সেটি আর ঘটতে দিলেন না কৃষকরাই। 


তারা এতকাল দেখেছেন আন্দোলনের সময় তাদের হয়ে কথা বলেছেন কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন মানুষেরা। এবার তাঁরা নিজেদের আন্দোলন নিজেরাই করছেন।  আমরা কিন্তু প্রতি মুহুর্তেই বলে চলেছি কৃষক আন্দোলন। কখনোই বলছি না গণ আন্দোলন। কিন্তু আগামীকাল কৃষকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন, গণআন্দোলনের পূর্ণ রূপ নিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আন্দোলন হয়ে উঠবে না, সে কথা দায়িত্ব নিয়ে কে বলবেন। শুধু কি তাই, আজ এই সময়ে আন্দোলনের আঙ্গিক ও রূপ কি হতে পারে, তার ভাষা ও কৌশল কি হতে পারে তার নীল নক্সা পাওয়া যাচ্ছে কৃষকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন থেকে। তারা এটাও শেখাচ্ছেন নিজেদের দাবিতে কিভাবে অনড় থাকতে হয়, কিভাবে আন্দোলনের কৌশল বদল করে চাপ সৃষ্টি করতে হয় সেটাও।  

(এই লেখায় যাবতীয় মতামত লেখক তপন মল্লিকের, আমাদের এই বিভাগটি সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার স্থল। এই প্রতিবেদনে কোনও তথ্যগত ভুল বা অন্যকোনও বিষয় বিতর্ক তৈরি করলে তার দায়ভার পুরোপুরি লেখকের। এর সঙ্গে এশিয়ানেট নিউজ বাংলার কোনও যোগ থাকবে না।) 

(তপন মল্লিক, একজন প্রোথিতযশা সাংবাদিক, সমাজ এবং আর্থ-সামাজিক, রাজনীতি, খেলা ও বিনোদন নিয়ে লেখালেখি করেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক হিসাবে যুক্ত ছিলেন, বর্তমানে তিনি ইনডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্ট হিসাবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত)