নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের খবর সামনে আসতেই কড়া আক্রমণ শানালেন রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, দেশের ভোটপ্রক্রিয়া, আইন ও সংবিধানের মধ্যে থাকা যোগসূত্রটা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত বলে দাবি করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা।

ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের মাঝেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন রাহুল গান্ধী। বৃহস্পতিবার লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, দেশ এখন এমন এক 'অভূতপূর্ব পরিস্থিতির' মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। তাঁর দাবি, ভোট, আইন, প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধানের মধ্যে যে যোগসূত্র বা শিকল ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

কমিশনকে নিশানা রাহুল গান্ধীর

নয়াদিল্লিতে একটি সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরেন। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন প্রক্রিয়ার পদ্ধতি, ডেটাবেস পরিবর্তন এবং ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) নিয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন দুই বর্তমান নির্বাচন কমিশনার— সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী।

এএনআই-এর একটি প্রশ্নের উত্তরে রাহুল বলেন, কমিশনের অন্দরের এই মতবিরোধ প্রমাণ করে যে ভারত এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে যা আগে কখনও হয়নি। তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে 'অ্যাপ্রুভার' বা রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানান।

রাহুল গান্ধী বলেন, "আমি বলেছি ওঁর (সিইসি জ্ঞানেশ কুমার) রাজসাক্ষী হওয়া উচিত... আগেই বলেছি, ভারতে এমন পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি। আমরা এখন সম্পূর্ণ নতুন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি... হঠাৎ করেই দেখছি ভোট, আইন, প্রতিষ্ঠান আর সংবিধানের মধ্যে থাকা শিকলটা ভেঙে গেছে। এটা একদমই নতুন একটা পরিস্থিতি।"

গণতান্ত্রিক কাঠামোয় আস্থা হারাচ্ছে মানুষ: রাহুল

রাহুলের দাবি, সাধারণ গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস অনেকটাই উঠে গেছে। কিন্তু ভয়ের কারণে মানুষ প্রকাশ্যে সে কথা বলতে পারছেন না। তিনি বলেন, "ভারতের সবাই বিশ্বাস করেন যে সিস্টেমটা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকেই মনে করেন এর আর কোনও অস্তিত্বই নেই। সুস্থ মস্তিষ্কের এমন কোনও মানুষ দেশে নেই, যাঁর মনে সিস্টেম নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটা ভয় কাজ করে, তাই মানুষ মুখ খুলতে ভয় পান।" তবে দুই নির্বাচন কমিশনারের এই আপত্তি তোলাকে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন তিনি। সাধারণ মানুষ ও আধিকারিকদের মুখ খোলারও আর্জি জানিয়েছেন রাহুল।

ভয় ও ভোট চুরি নিয়ে বার্তা রাহুলের

রাহুলের কথায়, "ভয়টা এখন কমছে। কারণ যে ২ জন নির্বাচন কমিশনার আগে ভয় পাচ্ছিলেন, তাঁরা এবার মুখ খুলেছেন। ওই দুই ভদ্রলোকের মতো দেশে আরও অনেক দেশপ্রেমিক আছেন যাঁরা সত্যিটা বলতে চান। ভারতের ভবিষ্যতের জন্য আমাদের মুখ খোলাটা খুব জরুরি। কারণ এই পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকাটা দেশবিরোধী কাজ।" এই পুরো পরিস্থিতিকে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর আক্রমণ বলে তোপ দাগেন রাহুল। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখতে এবং 'ভোট চুরি' আটকাতে কমিশন ব্যর্থ হয়েছে অভিযোগ তুলে, সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। ভোট চুরির এই চেষ্টার নেপথ্যে 'ষড়যন্ত্রকারী' হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের নাম সরাসরি উল্লেখ করেন তিনি।

রাহুল বলেন, "এটা ভারতের সংবিধানের ওপর সরাসরি হামলা। ভোট চুরি, আইন চুরি আর প্রতিষ্ঠান চুরি চলছে। দেশদ্রোহীদের শাস্তি পেতেই হবে।" প্রাতিষ্ঠানিক পতনের একটা পুরো চিত্র তুলে ধরে রাহুল সতর্ক করেন যে, মানুষের রায়কে এভাবে চুরি করলে সংসদের বৈধতা এবং সেখানে পাশ হওয়া সমস্ত আইনের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, "আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে ভোট চুরি থেকেই আইন চুরি হয়। কারণ ভোট চুরি হলে আইনি কাঠামোটাও শেষ হয়ে যায়। আর আইন চুরি থেকে আসে প্রতিষ্ঠান চুরি। এইভাবেই পুরো শিকলটা তৈরি হয়েছে। আজ ভোট শেষ, আইন তৈরির ব্যবস্থাও শেষ। তার মানে, যদি ভোট চুরি হয়ে থাকে এবং সংসদে বসে থাকা সাংসদরা সেই চুরি করা ভোটের জোরেই সেখানে গিয়ে থাকেন, তবে তাঁদের তৈরি করা যে কোনও আইনই বেআইনি। আমি আবারও বলছি, যদি ভোট চুরি হয় এবং সেই চুরি করা ভোটে জিতে সাংসদরা সংসদে ঢোকেন, তবে তাঁদের তৈরি করা সব আইন বেআইনি। আর তাঁরা যদি কোনও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন করেন, সেটাও বেআইনি।"

নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন

'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরেই এই রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, পুরো কমিশনের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়াই পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা হয়েছে বলে বারবার অভিযোগ তুলেছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের আমলে গত ১০ মাসে ১৪ বার লিখিতভাবে এই আপত্তি জানানো হয়। এর মধ্যে প্রধান ইস্যুগুলি ছিল— ইরোনেট (ERONET) ভোটার তালিকা ডেটাবেস প্ল্যাটফর্মের দ্রুত কেন্দ্রীকরণ, ফর্ম ৬-এ নতুন ভোটার রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে একতরফা পরিবর্তন এবং স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ার সময় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন এই দাবি খারিজ করে দিয়েছে। তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই আপত্তিগুলি কোনও কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক মতবিরোধ নয়। একটি বিবৃতিতে কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, খসড়া তৈরির সময় কাজের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন, অভ্যন্তরীণ মতামত এবং প্রশাসনিক পরামর্শ দেওয়াটা তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার একটা স্বাভাবিক অংশ। কমিশনের দাবি, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া সহ সমস্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে এবং তাতে তিন কমিশনারেরই অনুমোদন ছিল।

একদিকে বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন যখন এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতা ও স্বচ্ছতার পক্ষে সওয়াল করছে, তখন কংগ্রেস সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলি এর জবাবদিহি এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখার দাবি আরও জোরালো করেছে।