করোনাভাইরাস ও লকডাউনের কারণে দেশে যে আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে তা থেকে বার হতে কুড়ি লক্ষ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু সেই প্যাকেজ কতটা কার্যকরী? কতটা গ্রহণ যোগ্য? তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পাশাপাশি তুলনা শুরু হয়ে গেছে করোনা সংকট কাটাতে বিশ্বের বাকি দেশগুলি যে আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তারসঙ্গে। কারণ কারম আর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের স্থান বর্তমানে পাঁচ নম্বরে। আমাগী দিনে ফাইভ ট্রিনিয়ন ইকোনমির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। 

প্রথমেই আমরা চোখ রাখব ভারতের ব্যাঙ্কিং স্টিস্টেমের দিকে। কারণ ভারতীয় অর্থব্যবস্থার প্রধান চালিকা শক্তিই হয় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কগুলি। দেশের ৭০ শতাংশ ব্যাঙ্কই রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন। দেশের মোট সঞ্চয়ের অর্ধেকই ব্যাঙ্কে আমানত হিসেবে গচ্ছিত। আর্থিক সাশ্রয়ের মাত্র ২.৫ শতাংশই এখনও পর্যন্ত স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ হয়। সরকারি ব্য়াঙ্কগুলি দেশের ব্যবসাকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। সেখানে সম্পূর্ণ অন্যচিত্র জি-৭ দেশগুলির ব্যাঙ্কিং সিস্টেম।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাঙ্কের সংখ্যা কম। ব্যাঙ্কের গচ্ছিত সম্পদ ২০.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাষ্ট্রীয় পরিচালনাধীন ব্য়াঙ্কের পরিমাণ ০.০৩ শতাংশেরও কম। ফ্রান্সে রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাঙ্কের সম্পদের পরিমান ২.৬ শতাংশ। সরকারি বেসরকারি ব্যাঙ্কের ৮.৩ ট্রিলিয়ন। অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের আগেই রয়েছে জার্মানি। যার অর্থব্যবস্থা রীতিমত একটি মডেল। আর সেই দেশে ব্যাঙ্কের মোট সম্পত্তি ৯.১৬ ট্রিলিয়ন। যারমধ্যে সরকারি ব্যাঙ্কের সম্পদের পরিমাণ ২৬ শতাংশ। জাপানে রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাঙ্কের সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৪ শতাংশ। তাই ভারতের সঙ্গে প্রথম প্রথম বিশ্বের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের তুলনা খুব একটা যুক্তি সংগত নয়। পাশাপাশি ভারতীয় আর্থনীতির সঙ্গেও তেমনভাবে খাপ খায় না বিশ্বের বাকি দেশগুলির চিত্র। 

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন তার একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। এই প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্যই হল দেশের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে ত্রাণ সরবরাহ করা। পাশাপাশি দেশের আর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ পুনরায় চালু করা। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২৬ মার্চই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আগামী তিন মাস ধরে ৮০ কোটি মানুষকে খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত না করা। ইতিমধ্যেই ৩৬টি রাজ্যে ৬৭ লক্ষ টন খাদ্যশস্য সরবরাহ করা হয়েছে। আগামী তিন মাস ৮ কোটি মানুষকে বিনামূল্য গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। সেই অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত ৫০৯ লক্ষ গ্যাস সিলিন্ডার বুক করা হয়েছে। সরবরাহ করা হয়েছে ৪৮২ লক্ষ সিলিন্ডার। প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনার মাধ্যমে ৩৮ কোটি টাকা বিলি করা হয়েছে গরিব কৃষক ও মহিলাদের মধ্যে। যারমধ্যে এখনও পর্যন্ত কৃষকরা পেয়েছেন ১৬ হাজার কোটিরও বেশি টাকা। মহিলাদের মধ্যে বিলি হয়েছে ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকা। বিধবা ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১কোটিরও বেশি টাকা। প্রতিবন্ধীদের মধ্যে বিলি হয়েছে ৩৪৯২ কোটি টাকা। আর নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে বিলি হয়েছে ৩.৫ কোটি টাকা। 

২৬ মার্চের পর ১২ মে দুদুবার আর্থিক প্যাকেজের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। আর সব মিলিয়ে দেশের মানুষের কাছে আর্থিক সুবিধে পৌঁছে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য ছিল। দ্বিতীয়বার ঘোষণার পর তিন লক্ষ কোটি টাকার বিনামূল্যে ঋণ প্রদান করার কথা বলা হয়েছিল এমএসএমইদের মধ্যে। অভিবাসী শ্রমিকদের খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি মৎসজীবী, কৃষকদেরও একাধিক সুবিধের কথা বলা হয়েছিল। আর সেই সময়ই মনরেগা প্রকল্পেও জোর দেওয়া হয়েছিল। 

এরই মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছেন দেশের মহিলারা। কারণ তাঁদের অ্যাকাউন্টে যে সরবরাহ করা হয়েছিল তার অর্ধেকেরও কম টাকা তোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা অ্যাকাউন্টের আমানতও বেড়েছে। যাতে প্রমান হচ্ছে দেশের পিছিয়ে পড়ে শ্রেণির মহিলারা  কঠিন এই সময়েও সঞ্চয় করছেন। 

কিন্তু করোনা সংকট থেকে কবে মুক্তি পাবে দেশ তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাই জি-৭ দেশগুলি আর্থিক ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপ নিচ্ছে তা এখনও না নিয়ে পরবর্তী কালের জন্য প্রধানমন্ত্রী সঞ্চয় করে রেখে দিচ্ছেন বলেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।