রেনেসাঁ চক্রবর্ত্তী, কনট্রিবিউটার সাংবাদিক-- সালটা ১৯৮১। সবে নিজের  আইটি ফার্ম খুলেছেন নারায়ণ মূর্তি। পুনের টেলকোতে সেই বছরই প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সুধা। পুনেতেই দুজনের দেখা হয়। একবার ডিনার ডেটে গিয়েই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নারায়ণ। বলেছিলেন, 'আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই। আমি কোনওদিন বড়লোক হতে পারব না। তুমি খুব সুন্দরী, উজ্জ্বল ও বুদ্ধিমতী। তুমি অনেককেই পাবে জীবনে। কিন্তু তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?'

সেদিন আগামীর বড় মানুষটিকে চিনতে ভুল করেননি সুধা। আর তাই সেদিন চার হাত এক হয়েছিল।
স্ত্রী সুধার দেওয়া মাত্র দশ হাজার টাকা দিয়েই  ১৯৮১ সালে মূ্র্তি এবং আরও ছয়জন মিলে তৈরি করেছিলেন ইনফোসিস।তার পরেরটা অবশ্য ইতিহাস। আইটি সেক্টরে ভারতকে এক নব দিগন্তে পৌছে দিয়েছিল ইনফোসিস।

ভারতের আইটি সেক্টরের জনক তিনি  তাঁর সম্পর্কে এমনই বলেছিল ‘টাইমস ম্যাগাজিন’। ইনফোসিস-এর প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ মূর্তির আসল নাম নাগাভার রামরাও নারায়ণ মূর্তি । যদিও তিনি মূর্তি নামেই পরিচিত। 

মূর্তি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন আহমেদাবাদের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট’-এর চিফ সিস্টেমস প্রোগ্রামার হিসেবে। পরে পুণের ‘পাটনি কম্পিউটার সিস্টেমস’-এ যোগ দেন তিনি। ১৯৮১ সালে ‘ইনফোসিস’ গঠন করেন নারায়ণ। ‘ ১৯৮১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সংস্থার সিইও পদে তিনিই ছিলেন এবং পরে অর্থাত্‍ ২০০২ থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সংস্থার চেয়ারম্যান পদে। 

অন্যদিকে  নারায়ণ মূর্তির স্ত্রী সুধা মূর্তিও কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট এবং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কেরিয়ার শুরু করেন। তাঁর লেখা বেশ কিছু বইও রয়েছে। তার মধ্যে ‘ওয়াইজ অ্যান্ড আদারওয়াইজ’, ‘মহাশ্বেতা’ বিখ্যাত। 
 তার মধ্যে প্রথম বইটি সুধা মূর্তির জীবনের বেশ কিছু অভিজ্ঞতা অবলম্বনে লেখা। পদ্মভূষণ ও পদ্মশ্রী পুরস্কারেও পুরষ্কৃত হয়েছেন নারায়ণ মূর্তি।
 
১৯৪৬ সালে ২০ শে অগাস্ট কর্ণাটকে  সিডলাঘটটা জেলায়  জন্ম গ্রহণ করেন এন আর  নারায়ণ মূর্তি । তিনি স্কুলের পাঠ শেষ করে  ১৯৬৭ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি এমটেক ডিগ্রি অর্জন করেন আইআইটি কানপুর থেকে। আইআইএম আহমেদাবাদের একজন ফ্যাকাল্টির কাছে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ছিলেন মূর্তি। সেখান থেকে চিফ সিস্টেম প্রোগ্রামার হন তারপরই তৈরি করেন ভারতের প্রথম টাইম শেয়ারিং কম্পিউটার সিস্টেম।

১৯৮১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত একুশ বছর সংস্থার সিইও পদে তিনি ছিলেন। ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন এবং এর পরে  সভাপতি বোর্ডের মুখ্য পরামর্শদাতা ছিলেন মূর্তি।২০১১ সালের অগাস্টে অবসর নেন আই টি সেক্টরের এই প্রাণপুরুষ।

এইচএসবিসি-র কর্পোরেট বোর্ডের একজন স্বাধীন ডিরেক্টর ছিলেন মূর্তি  এবং তিনি ডিবিএস ব্যাংক , ইউনিলিভার, আইসিআইসিআই,  এবং এনডিটিভি-র পরিচালন বোর্ডে-ও একজন ডিরেক্টর ছিলেন।  
২০১৩ সালের পয়লা জুন কিছুদিনের জন্য আবার ইনফোসিসে ফেরেন নারায়ণ মূর্তি। এবার এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও আ্যডিশনাল ডিরেক্টর পদে। 


বিভিন্ন সময় সাহসী মন্তব্য করতেও পিছপা হন না নারায়ণ মূর্তি। এইওয়ান-বি ভিসাতে মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় ভারতীয়দের চাকরি করার প্রবল বিরোধী তিনি। তাঁর মতে বরং দেশেই এমন পরিবেশ গড়ে তোলা হোক যাতে তথ্য-প্রযুক্তি কর্মীদের বিদেশে গিয়ে কাজ করতে না হয়। এতে যেমন তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে নিজেদের শক্তি বাড়বে, তেমনই বিশ্বের দরবারে ভারতকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে বলেও মনে করেন নারায়ণ মূর্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এভাবেই নিজের মত প্রকাশ করছিলেন ইনফোসিসের যুগ্ম কর্ণধার এন আর নারায়ণ মূর্তি।

পূ্ত্র রোহন ইনফোসিসে যোগ দিলেও মেয়ে অখসতা বিদেশে পাড়ি দেন। অখসতার স্বামী ঋষি সুনক ব্রিটিনের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন। নারায়ণ এবং সুধাকে ভারতীয়রা চেনেন, দেশের প্রথম আইটি দম্পতি হিসেবে। নারায়ণ মূ্র্তি ও তাঁর স্ত্রী সুধা মূর্তিকে নিয়ে ছবি করছেন বলিউডের পরিচালক-প্রযোজক দম্পতি নীতেশ তিওয়ারি এবং অশ্বিনী আইয়ার তিওয়ারি। ছবি-তে শোনা যাচ্ছে বলিউডের প্রথমসারির তারকাদেরই রাখা হচ্ছে। তবে কাস্টিং এখনও চূড়ান্ত নয় বলেই জানা গিয়েছে।