ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে বাংলাকে যেন অনেকটাই ছাড় দিয়েছিল সুপার সাইক্লোন ফণী। কিন্তু ফণী নিয়ে রাজ্য- কেন্দ্র বিতর্ক যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না। প্রথমে ফণী পরিস্থিতি জানতে প্রধানমন্ত্রীর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করা নিয়ে চাপানউতোর। সেই বিতর্কের মধ্যে এবারে ফণী পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্যের বৈঠকের প্রস্তাব খারিজ করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার। কেন্দ্রকে জানিয়ে দেওয়া হল, রাজ্যের আধিকারিকরা ভোট নিয়ে ব্যস্ত। তাই ফণী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার মতো সময় তাদের হাতে নেই। স্বভাবতই রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রাজনীতির অঙ্কই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এ দিন ফণী পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ওড়িশায় যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েককে সঙ্গে নিয়ে আকাশপথে ফণী প্রভাবিত এলাকাগুলি ঘুরে দেখেন তিনি। এছাড়াও মুখ্যমন্ত্র-সহ রাজ্যের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি বুঝে নেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদসংস্থার খবর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও একই ধরনের বৈঠক করতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী. কেন্দ্রের তরফে সেই বৈঠক আয়োজনের জন্য রাজ্যকে জানানোও হয়। কিন্তু পত্রপাঠ সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার।. রাজ্যের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, সরকারি অফিসাররা ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সময় দেওয়া সম্ভব নয়।

স্বভাবতই রাজ্যের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে বার বারই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নরেন্দ্র মোদীকে মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রধানমন্ত্রী বলে কটাক্ষ করেছেন। ফণীর জেরে রাজ্যের যে বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদেরকেও যাবতীয় সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সোমবারের ভোট ধরলে রাজ্যে এখনও তিন দফার ভোট বাকি। এই পরিস্থিতিতে ভোটের মরশুমে ফণী নিয়ে বাংলায় এসে ভোটারদের প্রভাবিত করার কোনও সুযোগ প্রধানমন্ত্রীকে দিতে নারাজ তৃণমূল নেত্রী। বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, রাজনীতির কারণেই প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করা হল।

তবে রাজ্য সরকারের শীর্ষ সূত্রকে উল্লেখ করে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যেমর দাবি, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তরফে ফণী পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকের জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে কোনও ফোন আসেনি ।

এ দিন অবশ্য ওড়িশায় দিয়ে ফণী পরিস্থিতি সামলানোর জন্য নবীন পট্টনায়ক সরকারের দরাজ প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নবীনকে পাশে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগাম সতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কাজ করে ফণীর জেরে ক্ষয়ক্ষতিকে যথাসম্ভব কমাতে পেরেছে ওড়িশা প্রশাসন, তা অনুকরণীয়। ফণীর ধাক্কা সামলে ওঠার জন্য ওড়িশাকে এক হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাছাড়াও ওড়িশা সরকারের থেকে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত রিপোর্ট এবং তা সামলে ওঠার ব্লু-প্রিন্ট চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যার ভিত্তিতে প্রয়োজনে আরও অর্থ বরাদ্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। এ দিন আগাগোড়াই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক। ওড়িশায় গিয়ে মোদীর নবীন পট্টনায়েক সরকারের দরাজ প্রশংসা এবং কল্পতরু হওয়ার পিছনেও রাজনৈতিক অঙ্ক দেখছেন অনেকে। কারণ ভোট পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নতুন বন্ধুর প্রয়োজন হতে পারে নরেন্দ্র মোদীর। ফণী বিপর্যয়কে কাজে লাগিয়ে ওড়িশায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই ক্ষেত্রই প্রস্তুত করে এলেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বার্তা দিয়ে এলেন নবীন এবং তাঁর বিজু জনতা দলকে।

বিজেপি নেতারা অবশ্য বলছেন, এর মধ্য অহেতুক রাজনীতি দেখছেন বিরোধীরা। প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্রা তাঁর কর্তব্য পালন করছেন। বরং তাঁর প্রস্তাব খারিজ করে বাংলাকেই বঞ্চিত করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার। 

শনিবার ফণী পরিস্থিতি জানতে প্রধানমন্ত্রীর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালকে ফোন করা নিয়ে একপ্রস্ত বিতর্ক হয়। তৃণমূল প্রশ্ন তোলে, কেন মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন না করে রাজ্যপালকে ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী। এর পাল্টা প্রধানমন্ত্রীর দফতর দাবি করে, মুখ্যমন্ত্রীকে দু' বার ফোন করা হলেও রাজ্যের তরফ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।