'পেশীশক্তিকেই প্রথম অবলম্বন হিসাবে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে চিনাদের। যদি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পূর্ব লাদাখ সেক্টরে দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপ না নিত, তবে পরিস্থিতি হাতছাড়া হতে পারত। চিনের লক্ষ্য খুব সহজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যেতে না পারলে অন্তত তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠো। এটাই তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য।' গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষের পর প্রায় ১ বথর কাটতে চলল। ওই রক্তাক্ত সংঘর্ষের প্রথম বার্ষিকীর আগে, এশিয়ানেট নিউজ ভারত-চিন উত্তেজনা নিয়ে কথা বলল জয়দেব রানাডের সঙ্গে। একসময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সচিবালয়ের প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি সেন্টার ফর চায়না অ্য়ানালিসিস অ্য়ান্ড স্ট্র্যাটেজি-র সভাপতি। এশিয়ানেট নিউজকে জয়দেব রানাডে জানালেন, কেন ভারতের উচিত চিনকে একেবারে একমঞ্চে এনে তারপর আলোচনা শুরু করা।

প্রশ্ন: সীমান্তে কি গালওয়ান-এর মতো আরও কোনও ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে? ভারত ও চিনের মধ্যে কি সরাসরি যুদ্ধ বাধতে পারে? আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত?

ভারত সবসময় চেষ্টা করে যে কোনও দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যাওয়ার। তাই আমি নিশ্চিত, সরাসরি যুদ্ধ এড়ানোর বিভিন্ন উপায় খুঁজব আমরা। তবে আমাদের সঙ্গে যদি কেউ জোর করে দ্বন্দ্বে জড়ায়, তবে অবশ্যই মনোভাব হবে, তবে তাই হোক। আমার মনে হয় না চিনারা খুব সহজে জিতে যাবে। বস্তুত, আমি বিশ্বাসই করি না যে ওরা এরকম একটা যুদ্ধে কওনও পক্ষ জয় পাবে। দুই পক্ষই রক্তাক্ত হবে। সর্বাত্মক যুদ্ধ হলে তা হবে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটা দ্বন্দ্ব। তবে আমি মনে করি আমরা চিনকে প্রদতিরোধ করতে প্রচুর পদক্ষেপ নিয়েছি এবং তার জন্য়ই এখন চিনের পক্ষ থেকে সংঘর্ষ বিরতি রয়েছে। চিনারা তাদের পরিকল্পনা সংশোধন করছে এবং ভাবছে এখন তারা কী করবে।

প্রশ্ন: গালওয়ানের ঘটনার জবাবে ভারত বিপুল সংখ্যক চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি ফাইভজি চুক্তির বরাতও দেওয়া হচ্ছে না চিনা সংস্থাগুলিকে। এই অর্থনৈতিক আঘাত চিনের উপর কতটা প্রভাব ফেলেছে?

আমি মনে করি এই পদক্ষেপ আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। ফাইভজি চুক্তিতে চিনা সংস্থাগুলি নিষিদ্ধ করা খুবই ভাল লক্ষণ, কারণ ইতিমধ্যেই আমাদের টেলিযোগযোগ ক্ষেত্রের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চিনাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ভারতের টেলিযোগযোগ ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত দুটি চিনা সংস্থা - হুয়ায়েই এবং জেন। এমনকি সামনাসামনি যখন আমাদের ভারতীয় সংস্থারা বিক্রেতারা হিসাবে থাকলেও, এর পিছনে একটি উপ-চুক্তি  অনুসারে এই দুটি সংস্থাই ব্যাকরুমের কাজগুলি করে। সুতরাং, নজরদারি, কান পাতা, টেলিযোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটানো - সবই তারা খুব সহজেই করতে পারে। ভবিষ্যতের যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ফাইভজি-তে চিনাদের জড়িত করা হয়নি বলে আমি আনন্দিত।

দ্বিতীয়ত, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলি নিষিদ্ধ করায় চিনাদের অর্থনৈতিক দিক থেকে মূল্য চোকাতে হচ্ছে। এই সমস্ত অ্যাপ্লিকেশনগুলি ভারতে ৭০ কোটির বেশি ইউজারের বাজারের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। সুতরাং তাদের একটা বার্তা দেওয়া গেল, যদি আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না হয় এবং যদি চিনের কাছ থেকে সুরক্ষা সংক্রান্ত হুমকি থাকে, তবে ভারত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি থেকে তাদের নিরস্ত করতে অনেক সময় লাগবে।

প্রশ্ন: গালওয়ানের এক বছর পর চিন-ভারত সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? এগিয়ে যাওয়ার উপায় কী?

প্রথমেই আমাদের যেটা বুঝতে হবে, দুপক্ষের মধ্যে আর কোনও বিশ্বাস অবশিষ্ট নেই। আমরা যে তাদের বিশ্বাস করতে পারব না, সেটা নিশ্চিত করে দিয়েছে চিনারা। তারা প্রতিটি চুক্তি এবং আস্থা তৈরির পদক্ষেপগুলিকে অগ্রাহ্য করেছে। এই আস্থা তৈরি হয়েছিল অত্যন্ত কঠিন পথে। তাই দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে আর কোনও বিশ্বাস নেই। এখন যাই ঘটুক না কেন, আমাদের নিজেদের মতো করে বুঝে নিতে হবে এবং এদিক থেকে কী কী পদক্ষেপ আসছে তা দেখতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না যে, ভারত কখনও একতরফাভাবে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তবে চিনাদের সমান মাপের পদক্ষেপ ভারতকে নিতে হবে। তবেই আবার দুই দেশের সম্পর্ক এগোতে পারবে।

চিনা সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই ভারতীয় সেনাকে সীমান্ত থেকে দূরে থাকার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এটা অত্যন্ত সুবিধাজনক ধরণের যুক্তি। ব্যাপারটা অনেকটা আমরা তোমাদের সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, তবে তারপর কীভাবে চলতে হবে তা তোমাদের আমদের কাছ থেকে শুনতে হবে। আমার মনে হয়, এভাবে চলতে পারে না। চিনকে এক মঞ্চে আসতে হবে আলোচনা শুরু করার জন্য। একমাত্র তখনই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়গুলি এগোনোর আশা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, বর্তমান বিশ্বে চিনের বন্ধুর সংখ্যা খুব কম, মাত্র দুটি - পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া।