এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এবার রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শোকজ করল সুপ্রিম কোর্ট। ১৯ জানুয়ারির নির্দেশ কার্যকর না করার অভিযোগ নিয়েই এই শোকজ করা হয়েছে।

এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এবার রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শোকজ করল সুপ্রিম কোর্ট। ১৯ জানুয়ারির নির্দেশ কার্যকর না করার অভিযোগ নিয়েই এই শোকজ করা হয়েছে। ১৯ জানুয়ারির এক আদেশে সুপ্রিম কোর্ট পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং নির্বাচন কমিশনকে এসআইআর (SIR) কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ডিজিপি-র কাছ থেকে ব্যক্তিগত হলফনামা চেয়েছে, যেখানে তাঁকে তাঁর আচরণের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনের ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তার কারণ জানাতে হবে।

নির্বাচন কমিশন শীর্ষ আদালতে অভিযোগ করেছিল বাংলায় ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলার সংক্রান্ত সমস্যা হচ্ছে। এসআইআর-র কাজে নিযুক্ত অফিসারদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি জায়গায় হিংসাত্মক ঘটনাও ঘটেছে। ১৯ জানুয়ারি শীর্ষ আদালত, রাজ্য পুলিশের ডিজিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে নির্দেশ দিয়েছিল। কমিশনের অভিযোগ, সেই নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। কমিশন হলফনামা দিয়ে জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এরপরেই সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য পুলিশের ডিজিকে শোকজ করার বলেন সোমবারের শুনানিতে।

বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বলে, 'নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দাখিল করা পাল্টা হলফনামায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের অভিযোগ করা সত্ত্বেও আপত্তি ফর্ম পোড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর দায়ের করা হয়নি। সিনিয়র অ্যাডভোকেট গুরুস্বামী এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। আমরা পুলিশের ডিজি-কে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিচ্ছি, যাতে তিনি নির্বাচন কমিশনের পাল্টা হলফনামার বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিল করেন।'

সোমবার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়াকে নিয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, নথি ও আপত্তির যাচাই-বাছাইয়ের সময়সীমা অন্তত এক সপ্তাহের জন্য বাড়ানো হোক। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল। এখন সেটা পিছিয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কোনও 'বাধা' সৃষ্টি না করার জন্য সতর্ক করেছে। যদিও আদালত এই প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে উদ্ভূত প্রকৃত সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও হস্তক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, মাইক্রো অবজার্ভার বা রাজ্য সরকারি অফিসারদের উপর অর্পিত দায়িত্ব হবে শুধুমাত্র ইআরও-দের সহায়তা করা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইআরওদের হাতেই থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট আরও নির্দেশ দিয়েছে যে রাজ্য নিশ্চিত করবে ৮,৫০৫ জনই গ্রুপ-বি অফিসার মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডিইও বা ইআরও-র কাছে রিপোর্ট করবেন।

বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আবেদনের শুনানির সময় এই সতর্কতা জারি করা হয়। আদালত পশ্চিমবঙ্গ এসআইআর-এর অধীনে আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই এবং তথ্য চূড়ান্ত করার সময়সীমাও এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আদালতের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা বাধা দূর করব, কিন্তু এসআইআর (SIR) সম্পন্ন হওয়ার পথে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করব না। এই বিষয়ে আমরা যেন একেবারে স্পষ্ট থাকি।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী ডিএস নাইডু ইআরও নিয়োগ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে ইআরও-রা আধা-বিচারিক কার্য সম্পাদন করেন এবং তাই তাঁদের পর্যাপ্ত বিচারিক অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। নাইডু জানান যে, নির্বাচন কমিশন প্রায় ৩০০ জন গ্রুপ বি অফিসারের জন্য অনুরোধ করলেও, এই ধরনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মাত্র ৬৪ জন অফিসারকে নিয়োগ করা হয়েছে এবং বাকি নিয়োগগুলো বেতন সমতার ভিত্তিতে করা হয়েছে।

মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকাও উঠে আসে শুনানিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান যুক্তি দেন যে, বিশেষ করে এই প্রক্রিয়ার বিশালতার কথা বিবেচনা করলে, মাইক্রো অবজার্ভারদের মাধ্যমে ভোটারদের নাম বড় আকারে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টির জরুরি অবস্থা তুলে ধরে দিওয়ান আদালতকে জানান যে, এসআইআর প্রক্রিয়া ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, খসড়া ভোটার তালিকায় ৭.০৮ কোটি ভোটার রয়েছেন, যার মধ্যে ৬.৭৫ কোটি ভোটারের তথ্য মেলানো হয়েছে, প্রায় ৩২ লক্ষ ভোটারের তথ্য মেলানো বাকি আছে এবং ১.৩৬ কোটি ভোটারকে "যৌক্তিক অসঙ্গতি" বিভাগে রাখা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অর্ধেকেরও বেশি অসঙ্গতি ছোটখাট নামের পার্থক্যের কারণে হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি রাজ্যের বাইরে থেকে মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগের সমালোচনা করে যুক্তি দেন যে, তাঁদের অনেকেরই স্থানীয় পরিস্থিতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই। তিনি জানান যে, এই কাজে সহায়তার জন্য রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ৮০,০০০-এরও বেশি বুথ লেভেল অফিসার এবং হাজার হাজার গ্রুপ বি অফিসার-সহ প্রশিক্ষিত অফিসার দিয়েছে।

এই উদ্বেগগুলোর জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন যে, মাইক্রো অবজার্ভাররা ছিলেন একটি সহায়তা ব্যবস্থার অংশ, যা ইআরও এবং এইআরওদের সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং তাঁদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে যে, চূড়ান্ত ক্ষমতা ইআরওদের হাতেই থাকছে এবং অতিরিক্ত অফিসার নিয়োগ করলে সিদ্ধান্তের গুণমান উন্নত হতে পারে।

নির্বাচন কমিশন এখন এসআইআর-র কাজে যুক্ত ইআরও, এইআরও-দের বদল করতে পারবে। যোগ্য বিবেচিত হলে বর্তমান অফিসারদের ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখবে। তাদের বায়োডেটা সংক্ষিপ্তভাবে যাচাই করার পর এই রাজ্য সরকারি অফিসারদের মাইক্রো অবজার্ভার হিসেবে কাজ করার জন্য এক বা দু দিনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। নতুন সরকারি অফিসারদের নথি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সময় লাগতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নিতে ইআরওদের ১৪ ফেব্রুয়ারির পর আরও এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে।