নির্মলা সীতারামন যদি কখনও দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, অবাক হবেন না। আবার এমনও হতে পারে, তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন। কোনওটাতেই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, আমাদের দেশের রাজনৈতিক ট্রেন্ড তেমনটাই বলছে।

দেশের অন্তত এমন ৬জন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, যাঁরা পরবর্তীকালে হয় প্রধানমন্ত্রী নয় তো রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তবে অর্থমন্ত্রী পদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পদের রাজ-যোগই  বেশি দেখা গিয়েছে। এছাড়া,  জওহরলাল নেহেরু থেকে ইন্দিরা গান্ধি হয়ে রাজীব গান্ধি, প্রত্য়েকেই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন একবার-না-একবার বাজেট পেশ করেছিলেন।

আসুন দেখে নেওয়া যাক সেই ভাগ্য়বানদের তালিকা। এক-এক করে।

নেহেরু আমলের অর্থমন্ত্রী ছিলেন মোরারজি দেশাই। সংসদে তিনি ১০ বার বাজেট পেশ করেছিলেন। সময়ের কী প্য়ারাডক্স, পরবর্তীকালে, ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস বিরোধী জনতা সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। সেবার জরুরি অবস্থার কারণে ইন্দিরা গান্ধি তথা কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছিল।

মোরারজি দেশাই মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাজেট পেশ করেছিলেন চৌধুরি চরণ সিং। মোরারজি সরকারকে ফেলে যখন জনতা দলের আরেকটি গোষ্ঠী সরকার গঠন করে, তখন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন চরণ সিং। যদিও তার মাসছয়েকের মধ্য়েই নির্বাচন হয়। ১৯৮০ সালের সেই লোকসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্য়াগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরে আসেন ইন্দিরা গান্ধি।

১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ইন্দিরা গান্ধি অর্থমন্ত্রী করেন রামস্বামী বেঙ্কটরামণকে। আর তারপরেই অর্থমন্ত্রী হন ইন্দিরার চোখের মণি প্রণব মুখোপাধ্য়ায়কে। ইন্দিরা মন্ত্রিসভা ও পরবর্তীকালে,  প্রণববাবু সবমিলিয়ে ৭বার বাজেট পেশ করেন। যদিও ইন্দিরা গান্ধি নিহত হওয়ার পর যখন ১৯৮৪তে লোকসভা নির্বাচন হয় আর তারপর রাজীব গান্ধি প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন প্রণববাবু। পরে কংগ্রেস থেকে সাসপেন্ড হয়ে নিজে একটি দলও গড়েন। যদিও পরে তিনি ফিরে আসেন কংগ্রেসে। ২০১২ সালে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি মনোনীত হন।

রাজীব গান্ধি মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। পরে বোফর্স ইস্য়ুতে রাজীবের সঙ্গে মতান্তরের কারণে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এমতাবস্থায় ১৯৮৯ সালে জনতা দল, বিজেপি ও বামেরা মিলে জোট গড়ে দিল্লিতে ক্ষমতায় আসে। সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। যদিও তাঁর সরকার ক্ষণস্থায়ী হয়েছিল।

১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধি ক্ষমতায় ফিরে আসার পর প্রথমে অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন রামস্বামী বেঙ্কটারামণকে। ১৯৮০ থেকে ৮২ সাল অবধি অর্থমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালের ২৫ জুলাই তিনি দেশের অষ্টম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত হন বেঙ্কটারামণ।

এরপর যাঁর কথা উল্লেখ করতে হয়, তিনি এই দেশের এমন একজন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, যাঁর হাত ধরে দেশ নেহরু-অর্থনীতির পথ পরিহার করে  বাজার অর্থনীতির পথ ধরে। একদা রিজার্ভ ব্য়াঙ্কের সেই গভর্নরই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং টানা দশবছর ক্ষমতায় ছিলেন।  তিনি মনোনোহন সিং। ১৯৯১ সালে নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। সেইসময়ে প্রণব মুখোপাধ্য়ায়কে যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্য়ান করা হয়েছিল। দেশের অর্থমন্ত্রী হয়েও মনমোহন সিং 'স্য়ার' বলে সম্বোধন করতেন প্রণববাবুকে। কারণ, এর আগে প্রণববাবু যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন রিজার্ভব্য়াঙ্কের গভর্নর ছিলেন মনমোহন সিং। নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছিলেন ও ঐতিহাসিক বাজেট পেশ করেছিলেন মনমোহন সিং। পরে, ২০০৪ সালে কেন্দ্রে ইউপিএ-১ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মনমোহন সিং। আরও উল্লেখযোগ্য়, অর্থমন্ত্রী থেকে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন পরবর্তীকালে, তাঁদের মধ্য়ে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে  প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একমাত্র মনমোহন সিংই, টানা ১০ বছর।

সবশেষে বলতে এমন তিনজনের কথা, যাঁরা প্রধানমন্ত্রী পদে থেকেই বাজেট পেশ করেছিলেন কোনও-না-কোনও সময়ে। ওই তিনজন হলেন, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধি ও রাজীব গান্ধি।

অতএব, ভবিষ্য়তে যদি কোনওদিন মোদী সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকেও দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির পদ আলোকিত করতে দেখেন, তাহলে বিস্মিত হবেন না। অন্তত ট্রেন্ড তেমনটাই বলছে।