সব্যসাচী সিদ্ধান্ত. বিজ্ঞানী:  নোভেল করোনাভাইরাসের ত্রাসে প্রায় সারা পৃথিবী গৃহবন্দী, স্তব্ধ। বিভিন্ন দেশে লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। আমরা বিগত কয়েক মাসে এই ভাইরাস সমন্ধে অনেক কিছু পড়েছি, জেনেছি। কাগজে, বৈদ্যুতিন মাধ্যমে, আন্তর্জালে, সামাজিক মাধ্যমে। আমরা শুনছি এপিডেমিওলোজির বিভিন্ন তত্ত্ব, বিভিন্ন সংজ্ঞা। মহামারী বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন রকম সিমুলেশন মডেল নিয়ে কাজ করেন, মহামারীর ব্যাপ্তির পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য। সেই পূর্বাভাস থেকে সম্ভাব্য ব্যবস্থার আন্দাজ পাওয়া যায়। আমরা শুনছি হ্যামার এন্ড ডান্স মডেল, SEAR মডেল ইত্যাদির কথা। বিভিন্ন মাধ্যমে এসবের খুব সুন্দর বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: করোনা বিশ্বে হইচই ফেলে দিল ইমরানের দেশ, ৬০ বছর বয়সে গর্ভবতী পাকিস্তানি প্রৌঢ়

আমরা সবাই যারা মহামারী বিশেষজ্ঞ নই, তারা সেইসব গুঢ় তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ না করে, শুধু এই সংক্রমণ বৃদ্ধির হার বিষয়ক যা পরিসংখ্যান আছে সেগুলোকে একটু ভালো ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। গণিতের সাহায্যে। বিভিন্ন দেশে যখন এই সংক্রমণ দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছিল, অনেকেই ভাবছিলেন এই সংক্রমণ কেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই লাফিয়ে লাফিয়ে বা হু-হু করে বৃদ্ধির ব্যাপারটার ভিত্তি যদি আমরা একটু বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখবো যে সংক্রমণের এই বৃদ্ধি গণিতের কিছু নিয়ম মেনে চলছে। সংখ্যাতত্বের পরিভাষায় যাকে বলা হয় এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ বা বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি আমরা জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দেখতে পাই। আমরা অনেকেই কথায় কথায় 'এক্সপোনেনশিয়াল' শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। তার মানে আমাদের জানা থাকলেও, কখনো কখনো বাস্তবে তার প্রভাব সমন্ধে ওয়াকিবহাল থাকি না। যখন কোনো ছোট সংখ্যা এই নিয়ম মেনে খুব কম সময়ের মধ্যে একটা বড় সংখ্যায় পৌঁছে যায়, তখন তা দেখে বিস্মিত হই। অথচ সেটা গণিতের ওই নিয়ম মেনেই বেড়েছে। এই সংক্রমণের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। এই অতিমারীর বৃদ্ধি একটি গাণিতিক বাস্তব।

আরও পড়ুন: করোনা সংক্রমণের প্রভাব অর্থনীতিতে, নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে অভিবাসন বাতিল ট্রাম্পের

কোনো কিছু যখন এই বৃদ্ধির নিয়ম মেনে চলে, তখন তার বৃদ্ধির হার তার বর্তমান পরিমাণের সাথে সমানুপাতিক হয়। ভাইরাস এর অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ তাই এই বৃদ্ধির উৎকৃষ্ট উদাহরণ, কারণ বিদ্যমান সংক্রমণ থেকেই নতুন সংক্রমণগুলি ছড়ায়। খুব সোজা ভাবে বললে, কোনো একদিনের নতুন সংক্রামিতের সংখ্যা হলো আগের দিনের সংক্রামিতের সংখ্যার সঙ্গে এক (১) এর বেশি কোনো সংখ্যার গুনফল। আর সেই সংখ্যাটা ১এর থেকে কতটা বেশি তা নির্ভর করে বৃদ্ধির হারের ওপর। এই হার নির্ভর করে কতজন সংক্রামিত ব্যক্তি কতজন সুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন এবং তাঁদেরকে সংক্রামিত করার সম্ভবনা কতটা তার ওপরে। বাস্তব জীবনে যখন সামাজিক মেলামেশা বিদ্যমান তখন সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। কি ধরণের ভাইরাস, কিভাবে সংক্রমণ ছড়ায় ইত্যাদি। সেসব সম্ভাবনার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন বিশেষজ্ঞরা। সংক্রমণের সম্ভাবনা টিকার দ্বারা নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু টিকা এখনো আসেনি। তাই বিকল্প হলো সংক্রামিত ব্যক্তির সংস্পর্শে না আসা। যেহেতু এই অসুখে অনেক সময় উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না, তাই লকডাউন।

আমরা যদি তথ্য দেখি, বৃদ্ধির হারের হিসেবে মার্চের মাঝামাঝি চীনের বাইরে সংক্রামিতের সংখ্যা দশগুণ বাড়তে সময় লাগছিল গড়ে দুই সপ্তাহের কিছু বেশি। সেই অনুযায়ী এপ্রিলের প্রথম ভাগে সংখ্যাটা দশলাখে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল আর এপ্রিলের শেষের দিকে সংখ্যাটা এক কোটিতে পৌঁছে যাওয়ার কথা। বাস্তবে এরকম হওয়ার আগেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য। ইতালিতে যেমন প্রথম দিকে বৃদ্ধির হার ছিল ৩০ শতাংশের বেশি। বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর সেটা নেমে এসেছে ১০ শতাংশের নীচে। ভারতবর্ষের পরিসংখ্যান দেখলে প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে যে এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি আরম্ভ হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই বৃদ্ধির হার কমানো। আসলে বৃদ্ধির হার বেশি হওয়াতে খুব কম সময়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন যে অনেক উন্নত দেশের পক্ষেও সবাইকে সুষ্ঠ চিকিৎসা প্রদান করা মুশকিল হচ্ছে, বিশেষ করে যাঁদের ইনটেনসিভ কেয়ার দরকার পড়ছে। তাই সময় থাকতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাহলে বৃদ্ধির হার কমবে আর অতিমারীর শেষে সংক্রামিতের সংখ্যা অনেক হলেও তা অনেকখানি সময় ধরে হবে, যার দরুন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে না। এটাকেই বিশেষজ্ঞরা বলেন flattening the curve।
 
পৃথিবীতে এই পরিস্থিতি এক বিপর্যয়। স্বাস্থ্যে, অর্থনীতিতে, সর্বক্ষেত্রে। অর্থনৈতিক ভাবে অনেকে প্রচন্ড অসুবিধের মধ্যে পড়ছেন। সরকার নিশ্চয়ই তাঁদের যথাযথ সাহায্যের ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের দৃঢ়তার সাথে নিয়ম পালন করতে হবে। না হলে সংক্রমণ থামানো মুশকিল হবে, এবং লকডাউনের মেয়াদ বাড়বে। সেটা কিন্তু আরো অনেক বড় বিপর্যয় হয়ে দেখা দেবে।  পরিশেষে একটাই কথা বলি। গণিতের নিয়মে এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা হলেও, বাস্তবে তা আমাদের সবার জীবন। জীবনের মূল্য সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। পৃথিবীর এই কঠিন সময়, এই বন্ধুর পথে যেন আমরা সকলে নিজেদের সঠিক দায়িত্ব পালন করে জীবনের মর্যাদা রক্ষা করতে পারি।