তিন হাজার বছর আগে মৃত মানুষ। আর সেই মৃত মানুষের গলা থেকে বেরিয়ে এল কথা। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে কথা বলল এক  মৃত মানুষ। যার অস্তিত্ব ছিল খিষ্ট্রপূর্ব ১১ শতাব্দী-তে। নেসিয়ামুন নামে এই ব্যক্তি-র দেহ মমি করে রাখা হয়েছিল। 

নেসিয়ামুন ছিলেন একজন পুরোহিত। যার নিবাস ছিল প্রাচীন মিশরে। ১৮২৪ সাল থেকে এই মমির অস্তিত্বের কথা সামনে আসে লিডস সিটি মিউজিয়ামের সুবাদে। কারণ সেই সময় নেসিয়ামুনের মমিটি-র উপর থেকে কাপড়ের আস্তরণ সরানোর কাজ শুরু হয়েছিল ওই মিউজিয়ামে। এরপর থেকে এই মমিটি নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা হয়েছে। 

প্রাচীন মিশরের এই পুরোহিতের মৃত্যুর কারণ নিয় একাধিক মতবাদও রয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছিল যে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছিল নেসিয়ামুনকে। কিন্তু, নেসিয়ামুনের গলার গলার হাড় অক্ষত ছিল। গলা টিপে হত্যা হলে হাড় ভাঙার প্রভূত সম্ভাবনা থাকে। নেসিয়ামুন-এর তা ছিল না। এরপর বিজ্ঞানীরা জানান, নেসিয়ামুনের মৃত্যু হয়েছিল এক ধরনের পতঙ্গের অ্যালার্জি থেকে। ওই পতঙ্গ নেসিয়ামুনের আলজিহ্বায় আটকে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে অ্যালার্জি হয়ে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে মৃত্যু। একে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু বলেও ব্যাখ্যা করেছিলেন। নেসিয়ামুনের মমি নিয়ে পরীক্ষা করতে করতেই বিজ্ঞানীদের মাথায় বুদ্ধিটা আসে। কেমন করে কথা বলতেন নেসিয়ামুন? কীভাবে উচ্চারণ করতেন শব্দ। যদি সেটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রমাণ করা যায়! এরপরই শুরু হয় তোড়জোর। 

লিডস সিটি মিউজিয়ামের মৃতদেহ সংরক্ষণাগারে নেসিয়ামুনের মমির স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্রের একাধিক সিটি স্ক্যান করা হয়। কিন্তু, নেসিয়ামুনের মমির গলা থেকে আওয়াজ বের করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল তার জিহ্বা এবং আল-জিভ। কারণ, তিন হাজার বছর আগে মৃত্যু হওয়া নেসিয়ামুনের মমির জিহ্বায় লালা-র অস্তিত্ব বজায় থাকাটা কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। ফলে জিহ্বার যে একটা নরম গঠনতন্ত্র সেটা এক্কেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই বাধা অতিক্রম করার জন্য বিজ্ঞানীরা নানা ধরনের কেমিক্যালের সাহায্য নিয়ে জিহ্বা এবং আল-জিভ-কে নরম করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। 

 

এই ধাপ শেষ হতেই নেসিয়ামুনের কন্ঠস্বরের মধ্যে থাকা স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্রের উপরে কাজ শুরু করে দেন বিজ্ঞানীরা। স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে বায়ুর প্রবাহমানতা যা শ্বাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেটাকে কার্যকর করানোটা দরকার ছিল। না হলে নেসিয়ামুনের গলার আওয়াজ কেমন ছিল তা বের করাটা সম্ভব ছিল না। সেই কারণে, নেসিয়ামুনের মমির স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্রের থ্রি-ডি প্রিন্ট তৈরি করা হয়। এই থ্রি-ডি প্রিন্ট দিয়ে তৈরি করানো হয় হুবহু নেসিয়ামুনের স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্র। এই থ্রি-ডি প্রিন্টের স্বর প্রক্ষেপণ দিয়ে আওয়াজ বের করতে এবার বিজ্ঞানীরা সাহায্য নেন ইলেক্ট্রনিক ল্যারিনিস্ক এবং লাউডস্পিকারের মধ্যে বাকি কাজটা সমাধা করা হয়। 

বিজ্ঞানী দলের অন্যতম নেতা এবং পরে সায়েন্টিফিক রিপোর্ট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের লেখক অধ্যাপক ডেভিড হাওয়ার্ড, যিনি আবার ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রয়্য়াল হোলোওয়ে-র ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান, তিনি জানিয়েছেন, 'ইলেক্ট্রনিক ল্যারিনিক্সের সাহায্যে নেসিয়ামুনের মমি-র স্বরপ্রক্ষেপণে শব্দের প্রবেশ করানো হয়। কারণ, যে কোনও মানুষের গলার আওয়াজ থেকে শুরু করে উচ্চারণ সমস্ত কিছু নির্ভর করত স্বরপ্রক্ষেপণ যন্ত্র দিয়ে প্রবাহিত বাতাস এবং তার সঙ্গে লাং-এর যোগসূত্রের মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে এটা বলা সম্ভব নয় যে আওয়াজ এখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি হচ্ছে নেসিয়ামুন হুবহু এভাবেই কথা বলত। তবে, একটা ধারনা পাওয়া যায় যাতে অনুধাবন করা যায় তার কন্ঠস্বর কেমন ছিল। যে বাতাসের যে প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিমভাবে যে আয়াজের প্রবেশ ঘটানো হয়েছে তা নেসিয়ামুনের স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্রের আকার ও আকৃতি মেনে কর্ণগোচর হবে। এক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। এবং এতে প্রমাণিত যে আওয়াজ নেসিয়ামুনের মমির গলা থেকে বের করা গিয়েছে তা শুনতে অনেকটাই ইংরাজী অক্ষরের ভাওয়ালের মতো। এটা মনে করা যেতেই পারে, এই আওয়াজের সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্য ছিল নেসিয়ামুনের গলার আওয়াজের।'

হাওয়ার্ডের এই গবেষণা রীতিমতো চাঞ্চল্য ফেলে দিয়েছে বিশ্বে। এই পদ্ধতি যদি একশো শতাংশ নিখুত বলে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে এমনভাবে অনেক মৃত মানুষের গলার আওয়াজ বের করা সম্ভব বলেও মনে করা হচ্ছে। যদিও সেক্ষেত্রে সেই মৃত মানুষের স্বর প্রক্ষেপণ যন্ত্রটি পরীক্ষাগারে ব্যবহারের উপযোগী থাকতে হবেই দাবি করছে অধ্যাপক হাওয়ার্ডের দলবল।