ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ভগবান বিষ্ণুর 'কল্কি' অবতার বলে উল্লেখ করেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগে। মোদীর 'বিকশিত ভারত' গড়ার স্বপ্ন এবং 'B4B' নীতির মাধ্যমে ভুটানের উন্নয়নে তাঁর বিশাল অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তিনি।
দশ মাস আগের কথা। ভুটানের নির্বাচনে আমার দল হেরে যায়। সংসদে আমাদের কোনও প্রতিনিধি ছিল না। আমি তখন প্রধানমন্ত্রী বা সাংসদ, কিছুই নই। একদম সাধারণ নাগরিক হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি আমাকে যে সমর্থন জুগিয়েছিলেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানাই। বলি, তিনি সবসময় আমার কাছে বড় দাদার মতো। এরপরই তাঁকে একটা কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, আমি তাঁর মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর অবতারকে দেখতে পাই। আমাদের এই অঞ্চলে জ্ঞানী ও দূরদর্শী শাসকদের অনেক আগে থেকেই এভাবেই দেখা হয়। নিজের কথা শুনে আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, কেন এমন কথা বললাম? আমি কি আবেগের বশে বলে ফেলেছি? নাকি ভুল কিছু বললাম? কিন্তু যখন গভীরভাবে ভাবলাম, উত্তরটা পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বিষ্ণুর অবতার বলাটা একদম ঠিক ছিল।
আমি তাঁর মধ্যে একজন সত্যিকারের জনসেবককে দেখেছি। তিনি ভীষণ শৃঙ্খলাপরায়ণ, প্রাণবন্ত এবং অসম্ভব পরিশ্রমী। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ভারতীয়দের মনে নিজেদের এবং দেশের প্রতি এক গভীর বিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছেন।
মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্ব:
আমার মতে, নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে প্রজ্ঞা, সহানুভূতি এবং সাহস— এই তিনটি গুণের প্রকাশই হল দূরদর্শী নেতৃত্ব। আজ প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার স্বপ্নে এই গুণগুলো খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতার ঠিক একশো বছর পর, অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েছেন তিনি। ‘বিকশিত ভারত’-এর মাধ্যমে তিনি এই স্বপ্নকে একটা নাম, একটা সময়সীমা এবং একটা জাতীয় অভিযানের রূপ দিয়েছেন।
সহানুভূতি শুরু হয় অন্যদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বোঝার মাধ্যমে। আর বিকশিত ভারত ঠিক সেটাই তুলে ধরে। এটা ১৪০ কোটি ভারতীয়র একটা শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং উন্নত দেশ গড়ার যৌথ স্বপ্ন। ‘বিকশিত ভারত’ শুধু একজন নেতা বা একটা মেয়াদের বিষয় নয়। এটা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিষয়। ‘সবকা প্রয়াস’ (সবার চেষ্টা)-এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রত্যেক ভারতীয়কে শুধু এই অভিযানকে সমর্থন করতে নয়, বরং দেশ গড়ার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে ডাক দিয়েছেন।
‘বিকশিত ভারত’-এর ধারণা ভারতের সীমানা ছাড়িয়েও অনেক দূর বিস্তৃত। প্রধানমন্ত্রী মোদী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবসময় ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি ‘গ্লোবাল সাউথ’ (উন্নয়নশীল দেশগুলোর গোষ্ঠী)-এর স্বার্থের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। এর জন্য ‘ভয়েস অফ গ্লোবাল সাউথ’ সামিট আয়োজন করেছেন। পাশাপাশি, আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি-২০ (G20) গোষ্ঠীর স্থায়ী সদস্য করার ক্ষেত্রেও সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভারত যত শক্তিশালী হবে, তত বেশি অর্জন করতে পারবে। একটা উন্নত ভারত বিশাল বাজার তৈরি করবে, মূলধন ও প্রযুক্তি শেয়ার করতে পারবে। আর এই অঞ্চল এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বমঞ্চে বড় প্রভাব ফেলতে পারবে।
উন্নত ভুটানের প্রতি প্রতিশ্রুতি:
আমার কাছে বিষয়টা আরও বেশি ব্যক্তিগত। ‘বিকশিত ভারত’ মানেই ‘বিকশিত ভুটান’। ২০১৪ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিজের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভুটানকে বেছে নিয়েছিলেন মোদী। আমি তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলাম। তাঁকে স্বাগত জানানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই সফরে তিনি আমাদের সম্পর্ককে মাত্র তিনটি অক্ষরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন— B4B: ভারতের জন্য ভুটান; ভুটানের জন্য ভারত (Bhutan for India; India for Bhutan)।
কথাটা সহজ হলেও এর অর্থ অনেক গভীর। গত কয়েক বছরে তিনি এই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। ভারতের আর্থিক সাহায্যের জন্যই আমাদের একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় আমার প্রথম সরকার বড়সড় উন্নয়নমূলক কাজ করতে পেরেছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদী আমাদের দ্বাদশ পরিকল্পনার সময়েও সেই উদার অংশীদারিত্ব বজায় রাখেন। আর ২০২৪ সালে আমি যখন আবার ক্ষমতায় ফিরি, তখন তিনি আমাদের ত্রয়োদশ পরিকল্পনার জন্য ভারতের সাহায্য দ্বিগুণ করে ১০,০০০ কোটি টাকা করে দেন। আজ স্কুল-হাসপাতাল, রাস্তা-সেতু, জলবিদ্যুৎ, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প— পুরো ভুটান জুড়ে ‘B4B’ (ভুটান-ভারত অংশীদারিত্ব)-এর ছাপ স্পষ্ট। তবে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি (Gelephu Mindfulness City) নিয়ে আমাদের মহারাজার যে স্বপ্ন, তাতে ভারত যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, সেখানে B4B-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
আমার বলা কথাগুলো একদম ঠিক:
ভুটানের প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই অসাধারণ অবদানের কথা মাথায় রেখে, আমাদের মহারাজা যখন তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অফ দ্য ড্রুক গ্যালপো’ (Order of the Druk Gyalpo) প্রদান করেন, তখন সব ভুটানবাসী আনন্দে মেতে ওঠেন। তিনিই প্রথম এবং একমাত্র বিদেশি নেতা যিনি এই সম্মান পেয়েছেন। আজ প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন সরকার প্রধান হিসেবে ২৫ বছর পূর্ণ করছেন, তখন ২০১৯ সালের সেই হঠাৎ হওয়া কথোপকথন এবং ১৪ মার্চ ২০২৪-এর আমাদের পরের সাক্ষাতের কথা বারবার মনে পড়ছে। তাঁকে বিষ্ণুর অবতার বলার ঠিক পাঁচ বছর পরের দেখা ছিল সেটা। আমি তাঁকে বলেছিলাম, পাঁচ বছর আগের বলা কথাগুলো নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো আমি ভুল ভেবেছিলাম। কিন্তু শেষমেশ আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, আমার বলা কথাগুলো একদম ঠিক ছিল। ভগবান বিষ্ণুর শেষ অবতার— যিনি বিশৃঙ্খলা দূর করেন, ধর্মকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার করেন। তিনি হলেন কল্কি।



