বিশ্বজুড়ে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যমাত্রা যখন ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে, তখন কপ১৭-এ নতুন একটি নীতিমালার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে পশু কল্যাণ, জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোকে একসঙ্গে জুড়ে সরকারগুলোকে নতুন করে ভাবার পথ দেখানো হয়েছে।

আর্মেনিয়ায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে (কপ১৭) একটি নতুন আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সরকারগুলোকে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে পশু কল্যাণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

গত ২১ অক্টোবর কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটির (সিবিডি) কপ১৭ চলাকালীন এই নির্দেশিকাটি সামনে আনা হয়। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল রক্ষা এবং খামারের পশুদের কল্যাণের ওপর জোর দিয়ে দেশগুলোকে 'গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড হেলথ' বাস্তবায়নে সাহায্য করাই এর মূল লক্ষ্য।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সংরক্ষণের এই সংকটময় মুহূর্তে নির্দেশিকাটি প্রকাশ করা হলো। জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩০ শতাংশ স্থল ও সামুদ্রিক এলাকা সংরক্ষণের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বিশ্ব এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে।

এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য হারানো, জলবায়ু পরিবর্তন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগগুলোর পেছনে মূলত একই ধরনের কারণ লুকিয়ে আছে। পশুদের প্রতি আচরণ, ব্যবসা, খামার এবং সংরক্ষণের পদ্ধতিগুলো বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী, খামার ও বন্যপ্রাণীদের যেভাবে পরিচালনা করা হয়, তা থেকে রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা বাস্তুতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

বিশ্বজুড়ে এইচ৫এন১ (H5N1) এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ার সাম্প্রতিক উদ্বেগের কথাও এই নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

শুধু সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রার দিকে তাকিয়ে না থেকে, নীতিনির্ধারকরা যাতে এখনই কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে পারেন, সেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এই নির্দেশিকায়।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বন্যপ্রাণী ধরা ও ব্যবসার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থলের সুরক্ষা বাড়ানো এবং খামারের পশুদের কল্যাণে মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করা।

এছাড়া শহরের বুকে গাছের সংখ্যা বাড়ানো এবং বন্যপ্রাণীদের চলাচলের জন্য নিরাপদ করিডোর তৈরির কথাও বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপগুলো জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু— উভয়ের জন্যই দারুণ উপকারী হতে পারে।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপের উদাহরণ দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ

এই নীতিগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করতে পারে, তা বোঝাতে নির্দেশিকায় বিশ্বের বেশ কয়েকটি চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের কর্তৃপক্ষ গত এক দশক ধরে রাস্তা ও জলাশয়ের ধারে সবুজ করিডোরের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের ফলে সেখানকার গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। পাশাপাশি পাখি, বাদুড়, ব্যাঙ ও টিকটিকির মতো বন্যপ্রাণীরাও সেখানে ফিরে এসেছে।

বেলজিয়ামের পোষা প্রাণী ব্যবসার নিয়মকানুনের বিষয়টিও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৯ সালে দেশটি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য একটি 'পজিটিভ লিস্ট' চালু করে। এর মাধ্যমে কোন কোন প্রাণী আইনগতভাবে পোষা যাবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, যাতে বিদেশি প্রাণী ব্যবসার ঝুঁকি কমানো যায়। ব্রাজিল তাদের পরিবেশ কর্তৃপক্ষের পরিচালিত বন্যপ্রাণী স্ক্রিনিং এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে আরেকটি দারুণ উদাহরণ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে এই কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসার জন্য ৫৪ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী আনা হয়েছিল, যাদের সুস্থ করে আবারও প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

নির্দেশিকায় বাংলাদেশ এবং ক্যামেরুনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই দেশগুলোর 'ওয়ান হেলথ' কাঠামোতে পশু কল্যাণ, মানুষের স্বাস্থ্য এবং বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতার মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা আগে থেকেই স্বীকৃতি পেয়েছে। খাদ্য নীতির সিদ্ধান্তে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সমাজ এবং পশু কল্যাণের বিষয়গুলোকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তার উদাহরণ হিসেবে জার্মানির জাতীয় খাদ্য নির্দেশিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে।