জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ নিয়ে সরব হলেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়েও আলোচনা হয় এই বৈঠকে।

বৃহস্পতিবার জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘের দপ্তরে একটি বিশেষ আলোচনা চক্রের আয়োজন করেছিল 'ইন্টারফেইথ ইন্টারন্যাশনাল'। অনুষ্ঠানের নাম ছিল "ফাইট এগেইনস্ট টেররিজম অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস"। এই বৈঠকে মূলত পাকিস্তান থেকে পরিচালিত জঙ্গি সংগঠন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে জোরদার আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন

ইন্টারফেইথ ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল বিরো দিয়াওয়ারা এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। সাইপ্রাস, ভিয়েতনাম, বেলজিয়াম এবং তাঞ্জানিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।

প্যানেলে উপস্থিত ছিলেন গ্রিক পার্লামেন্টের সদস্য জর্জিওস মানউস, 'ইইউ টুডে'-র সাংবাদিক ও সম্পাদক গ্যারি কার্টরাইট, প্যারিসের 'আইডিয়াল ইন্টারন্যাশনাল'-এর প্রেসিডেন্ট স্টিফেন মিশট এবং 'হিমালয়ান রিসার্চ অ্যান্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন'-এর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক কে. ওয়ারিকু। ইরাকের 'ন্যাশনাল উইজডম মুভমেন্ট'-এর নেতা এবং আল-হাকিম ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আম্মার আল-হাকিম ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

টার্গেট পাকিস্তান

অনুষ্ঠানের শুরুতে দিয়াওয়ারা জানান, সন্ত্রাসবাদের শিকার হওয়া মানুষদের স্মরণ করতেই এই আয়োজন। যাঁরা বেঁচে ফিরেছেন এবং নিহতদের পরিবারের যে কষ্ট, সেটাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। এই কাজে সুশীল সমাজের দায়িত্বের কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন।

অনলাইনে বক্তব্য রাখার সময় আল-হাকিম ইরাকে সন্ত্রাসবাদের শিকার হওয়া মানুষদের কথা তুলে ধরেন।

গ্যারি কার্টরাইট সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদ এবং ইউরোপের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেই দিকেই তিনি বেশি জোর দেন। সন্ত্রাসবাদের ফলে সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হয়, প্রাণহানি, পরিবারের কষ্ট এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাব নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

কার্টরাইট বলেন, জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোকে যখন লোক নিয়োগ, তহবিল সংগ্রহ এবং কাজ চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তারা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও অস্থিরতা তৈরি করে। তিনি জানান, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের হামলায় পাকিস্তান নিজেও সন্ত্রাসবাদের কারণে চরম ভুগেছে।

একইসঙ্গে, পাকিস্তানের মাটি থেকে কাজ চালানো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভারত ও আফগানিস্তান সহ পাকিস্তানের বাইরে হওয়া বিভিন্ন হামলায় এই গোষ্ঠীগুলোর যোগসাজশ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

লস্কর-ই-তৈবা এবং জইশ-ই-মহম্মদের মতো সংগঠনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। সন্ত্রাসবাদের আন্তর্জাতিক প্রভাব বোঝাতে গিয়ে তিনি ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার উদাহরণ টেনে আনেন।

পকিস্তানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ

পাকিস্তানের মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও কার্টরাইট উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০২৫ সালের ইউরোপীয় কমিশনের একটি উত্তরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রকল্পগুলোতে মাদ্রাসার পড়ুয়ারাও যুক্ত ছিল।

তিনি অবশ্য পরিষ্কার করে দেন যে, তাঁর এই কথার মানে ধর্মীয় শিক্ষার বিরোধিতা করা নয়। সব মাদ্রাসাই যে চরমপন্থাকে উসকে দেয়, এমনটাও তিনি বলতে চাননি। তবে ইউরোপের টাকা কোথায় যাচ্ছে, কারা সেটা পরিচালনা করছে, সেখানে কী পড়ানো হচ্ছে এবং জঙ্গিদের নিয়োগ আটকাতে কী ব্যবস্থা রয়েছে, সেই বিষয়ে আরও স্বচ্ছতার দাবি জানান তিনি।

তাঁর বক্তব্যের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'জিএসপি প্লাস' (GSP+) বাণিজ্য সুবিধায় পাকিস্তানের লাগাতার ছাড় পাওয়ার বিষয়টি। কার্টরাইট প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের শর্তগুলো ঠিকমতো মানছে কি না, তা ভালোভাবে যাচাই না করেই কি এই সুবিধা চালিয়ে যাওয়া উচিত?

এই যাচাই পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত জিএসপি প্লাস সুবিধা স্থগিত রাখার দাবি জানান তিনি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে আরও কড়া ব্যবস্থা নিতে উৎসাহ দেওয়া।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক কে. ওয়ারিকুর একটি বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়। সেখানে জম্মু ও কাশ্মীরে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের ওপর জোর দেওয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষ পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি গত ১৫ বছরে জম্মু ও কাশ্মীরে যে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে, সে কথাও উল্লেখ করা হয়।

ওয়ারিকু রাষ্ট্রসংঘকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জঙ্গি এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করতে হবে। যারা সন্ত্রাসবাদে সাহায্য করছে বা টাকা জোগাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে একটি সুসংগঠিত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে তিনি জোর দেন।

জর্জিওস মানউস সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে কথা বলেন। তিনি যুক্তি দেন, পাকিস্তানকে শুধু সন্ত্রাসবাদের শিকার হওয়া দেশ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এমন একটা দেশ হিসেবে দেখতে হবে, যেখান থেকে বেশ কিছু জঙ্গি সংগঠন নিজেদের কাজকর্ম চালায়।

মানউস রাষ্ট্রসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্তরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর কথা উল্লেখ করেন। পাকিস্তানে থাকা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারতে হওয়া হামলার যে যোগসাজশ রয়েছে, তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। জম্মু ও কাশ্মীরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে হওয়া পহেলগাম হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তান থেকে পরিচালিত সংগঠনগুলোকেই দায়ী করেছে।

তিনি ২০০৮ সালের মুম্বই হামলা সহ আগের বেশ কয়েকটি হামলার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি কার্যকলাপের প্রভাব গোটা অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও ব্যাপকভাবে পড়ে।

পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে খ্রিষ্টানদের অবস্থা নিয়েও মানউস উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি পাকিস্তানের ব্লাসফেমি বা ধর্মনিন্দা আইনের অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী ও মেয়েদের ওপর হিংসা, জোর করে ধর্মান্তরকরণ এবং অপহরণের অভিযোগগুলোও তিনি তুলে ধরেন।

২০২৩ সালের আগস্টে জারানওয়ালায় হওয়া হামলার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সেখানে গির্জা এবং খ্রিষ্টানদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছিল বলে খবর। এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির অভাব নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পাকিস্তানের বাইরেও চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে মানউস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে পাকিস্তানি নাগরিকদের জড়িয়ে থাকার ঘটনাগুলোর কথা তিনি উল্লেখ করেন।

সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় নিপীড়ন এবং জোর করে ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে আরও কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ডাক দেন তিনি। তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা। চরমপন্থী হিংসা এবং অসহিষ্ণুতা যাতে গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের নীতিগুলোকে নষ্ট করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই অনুষ্ঠানে মূলত সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থী নেটওয়ার্ক, মানবাধিকার, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং ইউরোপের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও বেশি জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক স্তরে একজোট হয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।