কাঠমান্ডু থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ৭,২৩৪ মিটার (২৩,৭৩৩ ফুট) উচ্চতার লাংটাং লিরুং পর্বতের ঢাল থেকে শুরু হওয়া এই বিপর্যয় নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলকে ধ্বংস করে দেয়। উপগ্রহ চিত্র এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় যে, হিমবাহ-সংক্রান্ত এক বিশাল তুষারধসের (avalanche) মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছিল।

বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা কেবল বন্যা বা ভূমিধসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল এমন এক ভয়াবহ বিপর্যয় যার বর্ণনা দিতে ‘বিধ্বংসী’ শব্দটিও যেন অপর্যাপ্ত মনে হয়। কাঠমান্ডু থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ৭,২৩৪ মিটার (২৩,৭৩৩ ফুট) উচ্চতার লাংটাং লিরুং পর্বতের ঢাল থেকে শুরু হওয়া এই বিপর্যয় নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলকে ধ্বংস করে দেয়। উপগ্রহ চিত্র এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় যে, হিমবাহ-সংক্রান্ত এক বিশাল তুষারধসের (avalanche) মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছিল। প্রায় ২,০০০ ফুট চওড়া (অর্থাৎ আধ কিলোমিটারেরও বেশি চওড়া) হিমবাহের একটি বিশাল খণ্ড ধসে ৪,০০০ ফুট নীচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এই পতনের ফলে সৃষ্ট আঘাতের তীব্রতা হিরোশিমায় পরমাণু বিস্ফোরণের শক্তির প্রায় ৬.৩ শতাংশের সমান ছিল বলে ধারণা করা হয়, যা ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি করেছিল।

নীচে পড়ার পর বরফ ও পাথরের এই বিশাল স্তূপ জল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ১০০ ফুট উঁচু এক সুনামির ঢেউয়ে পরিণত হয় এবং ত্রিশূলী নদীর বুক চিরে তীব্র বেগে ধেয়ে আসে। নেপালের খাড়া ও বন্ধুর পাহাড় এই ঢেউয়ের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে নীচের জনবসতিগুলোর জন্য এটি এক ‘মৃত্যুর প্রাচীর’ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তুষারধসটি লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর দিকে ঘটেছিল। গুগল আর্থ এবং প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায় যে, এলাকাটি একটি বিশাল হিমবাহ দ্বারা আবৃত এবং অতীতেও এখানে বড় ধরনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।

একই দিন নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৮:৩৭ মিনিটে চিন সীমান্তের কাছে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়। ভূমিকম্পের কারণে পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়েছিল, নাকি বিশাল তুষারধসের ফলেই ওই ভূ-কম্পন অনুভূত হয়েছিল—এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যদি ভূমিকম্পই এর মূল কারণ হয়ে থাকে, তবে তা সম্ভবত আগে থেকেই অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকা তুষার ও বরফের স্তূপকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বরফ ও হিমবাহগুলো আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্ষাকালের শেষ পর্যায়ে পাহাড়ের ঢালগুলো প্রচুর তুষারে ঢাকা ছিল। হিমবাহ সরে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট ‘মোরেইন’ বা হিমবাহ-বাহিত শিলাখণ্ড ও পলিরাশির স্তূপগুলো জলে সম্পূর্ণ মিশে গিয়েছিল। অথচ আগে এগুলো ‘পারমাফ্রস্ট’ বা স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফের কারণে শক্তভাবে আটকে ছিল। লাংটাং লিরুং সম্পূর্ণভাবে নেপালের ভূখণ্ডে অবস্থিত হলেও ধসে পড়া ধ্বংসাবশেষের স্রোত ‘লেন্দে খোলা’ নদীকে অবরুদ্ধ করে ফেলে, যা চিন ও নেপালের মধ্যে সীমানা নির্ধারণকারী নদী। নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে সেখানে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয় এবং শীঘ্রই সেই বাঁধ ভেঙে যায়। কাদা ও বিশাল সব পাথরের একটি দেওয়াল ধেয়ে আসে ত্রিশূলী নদীর বুক চিরে নেপালের দিকে।

লাংটাং লিরুং পর্বতের অতীতেও রয়েছে এক মর্মান্তিক ইতিহাস

২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে এর দক্ষিণ ঢালে তুষারধসের সৃষ্টি হয়েছিল; সেই তুষার ও বরফের স্রোত নীচে হিমবাহের উপর আছড়ে পড়ে লাংটাং গ্রামকে মাটির নীচে চাপা দিয়েছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ৩০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বর্তমান দুর্যোগটি ঘটেছে একই পর্বতের উত্তর ঢালে। এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমালয় অঞ্চল বেশ কয়েকটি "হিমালয়ান সুনামি"-সদৃশ ঘটনার সাক্ষী হয়েছে—যেমন চামোলি (২০২১), মেলামচি (২০২১), সিকিম (২০২৩), থামে (২০২৪), ভোটে কোশি (২০২৫) এবং এখন ২০২৬ সালের ঘটনা। এর বেশিরভাগই ঘটেছে বর্ষাকালে। গত বছরের ৮ জুলাই ভটে কোশিতে সৃষ্ট বন্যায় ১৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই বন্যা নেপাল-চিন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পর্যটন চেকপয়েন্টটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং মহাসড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ধ্বংস করেছিল। বিজ্ঞানীরা সেই বন্যার কারণ হিসেবে হিমবাহের উপর সৃষ্ট হ্রদ বা 'সুপ্রা-গ্লেসিয়াল পন্ড'-এর স্ফীতি ও ফেটে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছিলেন। সে সময় চিনা পক্ষ স্থানীয় নেপালি কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল, কিন্তু এবার কোনও পূর্ব-সতর্কতা ছিল না। এ বছর তুষারধস ও বন্যার উৎসস্থলটি সীমান্তের অনেক কাছাকাছি হওয়ায় ধ্বংসস্তূপ ও কাদার স্রোত মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাসুয়া চেকপয়েন্টে পৌঁছে যায়।

১৬০ জন নিহত ও বহু প্রকল্প ধ্বংস

বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ১৬০ ছাড়িয়ে যায় এবং এই সংখ্যা কয়েকশোতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সারা রাত ধরে নারায়ণী নদীতে—যা ভাটির দিকে ২০০ কিলোমিটার দূরে নাওয়ালপরাসি জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত—মানুষ ও পশুর মৃতদেহ এবং ধ্বংসাবশেষ ভেসে যেতে দেখা গেছে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর উপর অবস্থিত অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং সাব-স্টেশন ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নুয়াকোটে অবস্থিত ২৫-মেগাওয়াট গ্রিড-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কাদার নীচে চাপা পড়ে যায়। নির্মীয়মাণ প্রকল্পগুলোও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর উপরের এক ডজন সেতু ভেসে যায়; এর মধ্যে কোনও কোনওটির ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ৭০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ভেসে যায়, যার ফলে উত্তরের রাস্তাগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবকাঠামো ও সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।