'সিঙ্গেলদের বিবাহ অভিযান' বলে একটি ফেসবুক পেজে আচমকাই চোখে পড়ল একটি পোস্ট। চোখে পড়ল এক যুবতীর ছবি। মাথায় চুল নেই, ভুঁরু বলেও কিছু নেই। অর্থাৎ, বিয়ের বাজারে রূপের বড়াই করার মতো কিছুই নেই সেই তার। তবু সেই যুবতী তাঁর ওই 'রূপ' নিয়েই জীবনসঙ্গী খুঁজছেন আর নেটিজেনদের বিবেকের উদ্দেশে যেন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, "কে হবে আমার জীবনসঙ্গী?"

 নিজেই নিজের নাম-ঠিকানা দিয়ে শুরু করছেন তাঁর পোস্ট-- শতরূপা সরকার, বয়স--২৪, উচ্চতা--৫.২ইঞ্চি, ঠিকানা-- ধাত্রীগ্রাম(নবদ্বীপের কাছে)।

শুরুতেই খানিখ ঝাঁকুনি খেতে হল। বয়ানটা ঠিক যেন পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনের মতো। যেমনটা খবরের কাগজে আমরা রবিবার করে দেখে থাকি। তবে এরপর এগোলেই পাল্টে যায় বয়ানের ধরন। পরিচিত ছক ভাঙতে থাকে। বাড়তে থাকে মধ্য়বিত্ত-অস্বস্তিবোধ। পাত্রী নিজেই তাঁর পরিচয় দিতে উদ্য়োগী হন, কোনও রাখঢাক না-করেই-- "কী অবাক হচ্ছেন?  মানতে পারছেন না! অসুবিধে হচ্ছে চিনতে?  হ্য়াঁ এটাই আমি। যার মাথায় চুল নেই, চোখের পাতা নেই, আইব্রো নেই, গায়ের লোম নেই, আমি সেই শতরূপা সরকার। পাঁচবছর বয়স থেকে অ্য়ালোপেপসিয়ার শিকার।"

প্রাথমিক পরিচয় পর্বের এহেন বয়ানে আমরা খানিক গা-ঝাড়া দিয়ে উঠি।  ভাবি, এ কোন সাহসী মেয়ে?

আমরা আবার পড়া শুরু করি। আড়চোখে একবার ছবির দিকে তাকাই। বুঝতে চেষ্টা করি, তথাকথিত সৌন্দর্য ব্য়াপারটা বিয়ের বাজারে পুরুষের না-থাকলেও চলে কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে তা যেন 'আ মাস্ট'। নইলে সে মেয়ের বিয়ে হবে কেমন করে? রবি ঠাকুরের কৃষ্ণকলি নিয়ে বাঙালি যতই রোমান্টিক হোক না কেন, পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনে দুধে-আলতা রঙের বাজার কে কবে মারতে পেরেছে?  

আবার পড়তে শুরু করি-- " অনেক হয়েছে। ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে... স্কুল, কলেজ, নিজের কাজের জায়গা, রাস্তাঘাটে, ট্রেনে, বাসে আমায় নিয়ে অনেকে হেসেছেন। নিজেকে সাজাবার জন্য় পরচুলা ব্য়বহার করি।... সবার সামনে মাথাটা ঢেকে রাখতে হবে কেন আবরণ দিয়ে? আমি কি রক্তমাংসের মানুষ নই?"

প্রশ্নটা যেন থাপ্পড়ের মতো সজোরে এসে গালে লাগল। বেশ একটা বড়সড় ঝাঁকুনি খেলাম। আমাদের মা-ঠাকুমাদের মুখ দিয়ে পুরুষতন্ত্র বরাবর বলে এসেছে, রূপ, লাবণ্য় আর লজ্জা না-থাকলে আর মেয়ে কীসের? কিন্তু যে মেয়ে নিজের রূপকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে, লাবণ্য়ের ধারণাকে নিজেই চ্য়ালেঞ্জ করে বসে  আর নিজের জীবনসঙ্গী খুঁজতে নিজেই নিজের ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে, সেই মেয়েকে গ্রহণ করতে কতটা রাজি থাকবে আমাদের সমাজ? হাজার হোক, পুরুষতন্ত্রের সযত্নে লালিত বহুদিনের ধারণা তো ফেসবুক প্রজন্মের মধ্য়েও তো কিছু  কম দেখা যায় না।

তা যাই হোক, এমন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার ফিরে এলাম শতরূপার লেখায়-- "আজ কোথাও মেকআপ না-শিখে যখন নিজে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছি(মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে) সেই সময়েও আমার আত্মবিশ্বাস ভাঙার চেষ্টা করছেন অনেকে। আমি কিন্তু ভেঙে পড়িনি। বরং আরও কিছু মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দিতে চাই নিজেকে উদাহরণ দিয়ে।... আমার এমন একজনকে চাই যে আমাকে বুঝবে। তার ফ্য়ামিলি আমাকে হাসিমুখে মেনে নেবে। আমি নিজে স্বাবলম্বী হয়ে তাকেও সাহায্য় করতে চাই।"

পাত্রপাত্রী বিজ্ঞাপন বা ম্য়াট্রিমোনিয়ার সাইটগুলো শতরূপার জন্য় নয়। শতরূপা তাই নিজেই খুঁজতে শুরু করেছেন নিজের জীবনসঙ্গী। হয়তো খুঁজে পাবেন। হয়তো পাবেন না।  তবে, শতরূপার এই পোস্ট নেটিজেনদের বিবেককে তো তোলপাড় করে দিতে পারলো, অন্তত খানিক্ষণের জন্য়-- মেয়ে মানেই 'মেয়েলি' নয়, 'পুতুল খেলা' নয়। এটুকুই বা কম কীসের?